মনের শান্তি অর্জনের আল্লাহর স্মরণ
Banglaprabah.com – য ভ ব আল ল হক ড – সবকিছুই আছে আমাদের কাছে, কেবল মনের প্রশান্তি নেই। পবিত্র কুরআন আমাদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে কোথায় সেই শান্তি পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণে অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮) নবীজি (সা.)-কেও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আপনি ধৈর্যের সাথে সেই সব লোকদের সাথে বসুন যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর প্রতিপালকের কাছে ডাকে, শুধু তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে।’ (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৮)
জিকির: আল্লাহর স্মরণের পদ্ধতি
জিকির শব্দটির অর্থ হলো স্মরণ করা। আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে মানুষ তাঁর সাথে একটি অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্কের ফলে তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সহজ হয় এবং মানুষ সরল ও সঠিক পথে অটল থাকার শক্তি অর্জন করতে পারে। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে সে দিনে-রাতে, গোপনে-প্রকাশ্যে—সব সময়েই জিকির করুক। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-বিকাল তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪১-৪২)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘জিকিরের ফজিলত শুধু তাসবিহ, তাহলিল, তাহমিদ, তাকবির ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি আমলই জিকির। আনুগত্যের সঙ্গে আমলকারী প্রত্যেক বান্দাই জিকিরকারী হিসেবে বিবেচিত হয়।’ (ইমাম নববি, আল আজকার মিন কালামি সাইয়্যিদিল বাশার, ৩৮, দারুল মিনহাজ, বৈরুত, ২০০৫)
অস্থির মনের মহৌষধ: জিকিরের পদ্ধতিসমূহ
আল্লাহকে স্মরণ করার অনেক পদ্ধতি রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে বহু আমল ও পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ্ধতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. চিন্তা ও ফিকির
সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে স্রষ্টার পরিচয়, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর কুদরত ও সৃষ্টির রহস্য উপলব্ধি হয়। ফলে তাঁর প্রতি বিশ্বাসের মাত্রা বেড়ে যায়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনে ও দিন-রাতের আবর্তনে বহু নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং বলে,) হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি।’ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৯০-১৯১)
২. নামাজ
যে নামাজ নামাজিকে আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত করে তোলে এবং নামাজির অন্তরে এই অনুভূতি জন্মায় যে সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছে, তিনি তাকে দেখছেন, তাহলে সেটা হবে আল্লাহর জিকির সমৃদ্ধ আলোকিত নামাজ। এমন নামাজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে নামাজ কায়েম করো।’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৪)
৩. কুরআন পাঠ
মহানবী (সা.) কুরআন পাঠ করাকে সর্বোত্তম জিকির আখ্যা দিয়েছেন। কুরআনেই বলা হয়েছে, ‘মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কম্পিত হয়। আর যখন তার আয়াতসমূহ তাদের কাছে পাঠ করা হয়, তখন তাদের ইমান বাড়ে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২)
৪. মাসনুন দোয়ার আমল
দৈনন্দিন জীবনে কত রকমের কাজই তো করা হয়। সেসব কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা এবং সমাপ্তির পর তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করাও জিকির। মহানবী (সা.) দৈনন্দিন কাজের যেসব দোয়া আমাদের শিখিয়েছেন এগুলোতে অভ্যস্ত হলে পুরো কাজই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। ঘুম, খাওয়া, চলাফেরা, কথাবার্তা, মসজিদে যাওয়া-আসা ইত্যাদির দোয়াগুলো পড়ুন। এগুলো পাঠের অভ্যাস গড়ে উঠলে জীবনের পুরো সময় আল্লাহর স্মরণ ও সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় হবে।
৫. তাসবিহ পাঠ
প্রত্যেক নামাজের পর এবং সকাল-বিকেল ও রাতে নিয়মিত কিছু তাসবিহ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ করা। বিশেষ করে প্রত্যেক নামাজের পর একবার আয়াতুল কুরসি ও তাসবিহে ফাতেমির আমল করা। তাসবিহে ফাতেমি হলো, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ আল্লাহু আকবার পাঠ করা। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসি পাঠ করে, তার জান্নাতে যাওয়ার পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না।’ (আস-সুনানুল কুবরা, নাসাই, হাদিস: ৯৯২৮)
তাসবিহে ফাতেমি সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার ও আল্লাহু আকবার ৩৩ বার পাঠ করবে (এই হলো ৯৯) এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আ’লা কুল্লি শাইঈন কাদির’ পড়ে ১০০ পূর্ণ করবে, তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯৭)
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী

