ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ভেদ করছে
Banglaprabah.com – ম র ক ন প রত রক – মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। জর্ডানে অবস্থিত একটি আমেরিকান সামরিক কেন্দ্রে সম্প্রতি ইরানের হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়াও আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সক্ষমতার এই প্রমাণ পাওয়া গেছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পাঁচ মাস পরেও মার্কিন বাহিনীতে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটানোর ক্ষেত্রে।
গত মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো ইরানি হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সেনার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার এই ঘটনাটি ঘটেছে। পেন্টাগন এখনো হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের জন্য এটি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা এখনো ধরে রেখেছে ইরান, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের অবস্থান ও দুর্বলতা
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান ও দুর্বল পরিকাঠামোর কারণেই ইরান এখনো এ অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের নিশানা বানাতে পারছে। লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এ মন্তব্য করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। এসব সেনা মূলত এমন কিছু স্থায়ী ঘাঁটিতে কাজ করছেন, যা ইরানের দিন দিন শক্তিশালী হতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের একদম নাগালের মধ্যে রয়েছে এবং বেশ অরক্ষিত। সেনাদের অনেকেই অবস্থান করছেন আধা স্থায়ী কিছু ব্যারাকে। এগুলো মূলত রকেট, মর্টার বা দেশীয় প্রযুক্তির বোমার (আইইডি) আঘাত সামলানোর মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। ফলে ভারী যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এগুলোর নেই।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পুনর্গঠন
ডিফেন্স প্রাওরিটিজ নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ আল–জাজিরাকে বলেন:
ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী। প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে তারা নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে।
জেনিফার কাভানাফের ধারণা, সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের এ হামলাগুলো আরও বেশি নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন:
ইরানের সামরিক বাহিনী কোনোভাবেই যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়েছে এমনটা নয়, যেমন পেন্টাগন দাবি করেছিল। এটি সত্যি, তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, তবে সময়ের সঙ্গে তারা নতুন শিক্ষা নিচ্ছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ও মার্কিন সেনাদের ক্ষতি
ক্রিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ঘাঁটিতে আঘাত না হানলেও এর তীব্র বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনারা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে পড়ছেন। আবার ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হলেও সেটির ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও সেনারা আহত হচ্ছেন।
চলমান এ যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অফিশিয়ালি নিহত সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার ও সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত মার্কিন সেনা নিহত হন। জর্ডানের এই তিনজন ছাড়া অন্য সেনাদের মৃত্যু ইরানের সরাসরি হামলায় হয়নি বলে সামরিক বাহিনী দাবি করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্চে জ্বালানি নেওয়ার সময় এক বিমান দুর্ঘটনায় ছয় বৈমানিক নিহত হন। আর অতি সম্প্রতি ইরাকে ভূপাতিত করা একটি সশস্ত্র ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সার্জেন্ট প্রাণ হারান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
৮ জুলাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, ভবনসহ প্রায় ২২০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ইরান দিন দিন উন্নত করে তোলা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের ওপর নির্ভর করছে।

