মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?
Banglaprabah.com – মধ যপ র চ য র দ – দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের জন্য শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম কল্যাণকর স্তম্ভ। গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পর্যন্ত—প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স একটি অদৃশ্য চালিকা শক্তির মতো কাজ করছে। তবে সেই মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে লাখো বাংলাদেশির স্বপ্ন, চাকরি এবং বৈদেশিক মুদ্রার উৎস ছিল, তা দ্রুত পরিবর্তনের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ধোঁয়া বা তেলের বাজারের ওঠানামার চেয়েও বড় এক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে শ্রমবাজারের অভ্যন্তরে। এখানে অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ক্রমশ কমছে।
প্রযুক্তির উত্থান ও জাতীয়করণ নীতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের হাতে করা বহু কাজের বিকল্প হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে জাতীয়করণ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী এক দশকে এসব দেশে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদার ধরন সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—যদি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আগের মতো উন্মুক্ত না থাকে, তবে দেশের অর্থনীতি, রেমিট্যান্স এবং উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নটি আর কাল্পনিক নয়; বরং এটি ক্রমশ নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এটি শুধু কতজন বাংলাদেশি বিদেশে যাবে, তা নয়; বরং আগামী দশকে আমাদের শ্রম রপ্তানির প্রচলিত মডেলটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েই আলোচনা।
শ্রমিক পাঠানোর বর্তমান পরিস্থিতি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁদের বড় অংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে এই দেশগুলো থেকে। কিন্তু এই বিপুল জনশক্তির বেশির ভাগই স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিক। গত তিন দশক ধরে এই মডেলটি সফল ছিল কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু সেই অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, পর্যটন, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত শিল্পের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে চলছে ‘সৌদীকরণ’, কাতারে চলছে ‘কাতারীকরণ’, সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলছে ‘আমিরাতকরণ’, কুয়েতে চলছে ‘কুয়েতীকরণ’ আর ওমানে চলছে ‘ওমানীকরণ’ তথা নিজেদের নাগরিকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিচ্ছে। তারা দেখেছে, দু–এক বছরের মধ্যে আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪.৬ শতাংশ চাকরি (প্রায় ৮০ লাখ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে আর প্রায় ২.২ শতাংশ চাকরি (প্রায় ১২ লাখ) স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমের পরিবর্তে দক্ষ ও প্রযুক্তি-সক্ষম কর্মীর চাহিদা বাড়বে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আরব অঞ্চলের কর্মসংস্থানের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ খাতে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, আরব অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান নির্মাণ, উৎপাদন, পরিবহন, বাণিজ্য ও আতিথেয়তা খাতের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কেন্দ্রীভূত, যেখানে বিদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
সংস্থাটির ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরব অঞ্চলে মোট কর্মঘণ্টা ৩.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই হ্রাস ১০.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার ধাক্কারও চেয়ে বড়।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
এ প্রবণতা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশেও দেখা যাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই এসব জাতীয়করণ নীতির মূল উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অটোমেশন, স্মার্ট লজিস্টিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা পুনরাবৃত্তিমূলক স্বল্প দক্ষ কাজের চাহিদা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে অবকাঠামো নির্মাণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পগুলোর গতি ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছানোয় মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক নির্মাণশ্রমিকের চাহিদাও আগের মতো নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এখন পরিমাণের চেয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিশেষায়িত পেশাগত যোগ্যতার মূল্য দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশসহ প্রচলিত শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতায় কর্মসংস্থান সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবেন অভিবাসী শ্রমিকেরা। কারণ, এই দেশগুলোর নতুন শ্রমিক নিয়োগ কমার এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ দুর্বল হওয়ারও প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। কারণ, এটি শুধু শ্রমবাজারের সংকট নয়—আমাদের উন্নয়ন কৌশল, বৈদেশিক আয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।

