প্রেম তুমি
Banglaprabah.com – প র ম ত ম – অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় বা ভোকেশনাল শিক্ষা। হাসানের মেয়ে ইশি এখন ইয়ার ওয়ান ইলেভেনে পড়ছে। বাংলাদেশে একে বলা হতো ইন্টারমিডিএট ফার্স্ট ইয়ার। গ্রামের দিকে তাকালে আইএ পড়ছে—এই কথাটিও শোনা যেত।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তির ফর্ম তুলেছিল হাসান শহরতলির এক অখ্যাত স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে। শুরুতে আসন সংখ্যা ছিল দুইশো। পরে তা বাড়িয়ে চারশো করা হয়। সেই সময়ে হাসানের স্কুলের বন্ধু আনুও ভর্তির সুযোগ পায়। ক্লাস শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হওয়ায় নানা ঝামেলা লেগেই থাকত। মেয়েরা কমনরুম থেকে স্যারদের পেছন পেছন ক্লাসে আসত, আবার তাদের পেছন পেছন চলেও যেত। এই আসা-যাওয়ার পথেই মেয়েদের সাথে সামান্য দেখাদেখি হতো।
একদল মেয়ের মধ্যে হাসানের চোখে আলাদাভাবে ধরা পড়েছিল একজন। কলেজের দুটো বছর তার কেটে গিয়েছিল স্বপ্নের মতো। পুরো সময়টা কল্পনার মধ্যেই কাটতো। ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শুরু হলে জীবনের অন্যপথ দেখল সে। সকালে নাশতার পয়সা নেই। ধারদেনা করে ডাইনিংয়ের ছয়শো টাকা জমা দিলে দুপুর আর রাতের খাওয়া নিশ্চিত হতো। টিউশনি পাওয়া ছিল কঠিন। পেলেও টিকিট রাখা ছিল আরেক ঝক্কি।
কিশোর বয়সের সেই স্বপ্নের মানুষটার সাথে যোগাযোগ হলো। এই যোগাযোগে কারও কোনো স্বার্থ নেই। এটা নিখাদ বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। তার সাথে কথা বললে হাসান যেন কলেজের দিনগুলো ফিরে যায়। একধাক্কায় তার বয়স ত্রিশ বছর কমে ষোলোতে নেমে আসে।
বলা হয়, অভাব যখন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, প্রেম তখন জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। হাসানের ক্ষেত্রেও এমনটাই হলো। রূপ বাস্তবতার চোখরাঙানিতে কাল্পনিক প্রেম ফিকে হয়ে এল। কর্মজীবন শুরু হলো। তারপর সংসার। সব ছেড়েছেড়ে প্রবাসে থিতু হওয়া। এখন তার নিজের মেয়েই বাংলাদেশের হিসেবে কলেজে পড়ে। বারবার কলেজজীবনের স্মৃতি মনে এসে ভিড় করে। যাকে নিয়ে এত স্মৃতি, সে হয়তো জানেও না।
দেশে থাকতে দেশের প্রতি যতটা মমতা বোধ করত, বিদেশে এসে সেটা যেন শতসহস্র গুণ বেড়ে গেছে।
বিদেশে আসলে বেড়ানোর জন্য। বিদেশে আসার সপ্তাহখানেক সময় সবাই মুগ্ধ হয়ে আহা-উহু করে। এরপর বুঝতে পারে, এর মধ্যে প্রাণ নেই। সুন্দর তখনই প্রকৃত সুন্দর, যখন এর পাশে অসুন্দরও বিদ্যমান থাকে। খাবার তখনই সুস্বাদু লাগে, যখন আসলে ক্ষুধা পাওয়া যায়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
প্রবাসের প্রথম দুটো বছর যুদ্ধ করার পর যখন জীবন একটু থিতু হলো, হাসান যেন আবার নিজেকে ফিরে পেল। তখনই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘোরাফেরা শুরু করল। তুলনামূলক আলোচনা মনের মধ্যে ভিড় করতে শুরু করল। দেশের স্মৃতিগুলোই একমাত্র তাকে একটু স্বস্তি দিল। দেশের সবার সাথে যোগাযোগ নতুন করে তৈরি করার তাগাদা অনুভব করল। শৈশবের খেলার সাথি আজাদ, প্রাথমিকের সহপাঠী কামাল, গণি আর বড় ভাই বাবলু—সবার সাথে যোগাযোগ হলো। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে তো আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল।
ফ্ল্যাশমব জিনিসটা এখন খুবই প্রচলিত। এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়—সব ক্লাসের শিক্ষার্থীরাই এটা বানায়। হাসান ইউটিউবে এই সব কলকাকলি দেখে আর নিজেদের সময়ের কথা ভাবে। হাসান কখনোই বুঝতে চাননি বা বোঝার চেষ্টাও করেনি যে ভালোবাসা বা প্রেম কী। কারণ, তার হাইস্কুলের বন্ধুরা তার সামনেই প্রেমে পড়ে ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তার এসব বিলাসিতা করার সুযোগ বা সাধ্য কোনোটাই ছিল না।
তার জীবনের মন্ত্রই ছিল নচিকেতার গান, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? যদি না বাসো, তবে পরোয়া করি না…’। কিন্তু সে যে মনে মনে চাইত না, এমন নয়। যখনই প্রেম নিজে থেকে গায়ে পড়ে এসেছে, তখন সে পালিয়ে বেঁচেছে।
একটাই জীবন। অন্যের কথা উঠ-বস করে কাটিয়ে দেওয়ার কোনো মানেই সে খুঁজে পায়নি। প্রেমিকেরা হচ্ছে প্রেমিকাদের পোষা কুকুর। রাগ হলে লাথি দেওয়া, আবার রাগ পড়লে গলায় বাঁধা দিতে টান দিয়ে একটু আদর করে দেওয়া। এমন সব কথাবার্তা বলেই কত জুনিয়র প্রেম ভেঙে দিয়েছিল। তাই তার চরিত্রের মধ্যে প্রেমিকের যেসব গুণ যেমন ধীরে হাঁটা, ফুচকা খাওয়া, মিথ্যা প্রশংসা করার মতো বিষয়গুলোর ছিটেফোঁটাও লক্ষণ নেই। সে এক বন্ধনহীন মানুষ।
মধ্যবয়স পারি হয়ে আসা হাসানের কাছে ভালোবাসা, প্রেম এখনো তাই অধরা বিষয়। তবে এখনো হঠাৎ হঠাৎ কারণে-অকারণে তার মন উদাস হয়ে যায়। সংসারের দায়িত্বের চাপ একটু কমলেই মনটা স্মৃতির নদীতে ডুব দেয়। আর সাঁতরে চলে সেই নদীর স্রোতের সাথে। এভাবেই হয়তো বাকি জীবনটা কেটে যাবে। প্রেম এখনো তার কাছে শুধুই একটা অনুভূতিমাত্র। গায়ক হাসানের গাওয়া গানটার কথা তাই সব সময় আমাদের মনে পড়ে।

