ময়মনসিংহে প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ কেন্দ্র চালু
Banglaprabah.com – প রয ক ত ন র ভর – ফুডটেক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠানটি ময়মনসিংহের তারাকান্দায় এলাকায় একটি উন্নতমানের অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপন করেছে। এই কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে মাছ চাষের ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পদ্ধতিগুলো প্রচার করা। উদ্যোক্তাদের জন্য আয়োজিত এই কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালিত হবে।
মঙ্গলবার বানিহালা ইউনিয়নের মাঝিয়ালি গ্রামে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় দুইশত জন অংশগ্রহণ করেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ, উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা, গবেষকবৃন্দ, শিক্ষাবিদগণ এবং স্থানীয় মৎস্যচাষিরা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫০ লাখ টনেরও বেশি মাছ উৎপাদিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনো অনেক সম্ভাবনা অব্যবহৃত রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই লক্ষ্যে ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ফুডটেক বাংলাদেশ’ কর্মসূচি শুরু হয়। লারিভ ইন্টারন্যাশনাল ও লাইটক্যাসল পার্টনার্সের বাস্তবায়নে পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে। পদ্ধতি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষামূলক চাষ এবং বাজারসংযোগ উন্নয়নে এই যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। তবে উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান এবং টেকসই মৎস্য চাষে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগে আধুনিক পদ্ধতি ও উদ্ভাবন ব্যবহার করে কৃষকদের উৎপাদন ও আয় বাড়ানো সম্ভব।
নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জরিস ভ্যান বোমেল এই মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, মাছের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মাছের মূল্যও বাড়বে। এই প্রকল্প সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সীমিত জমি ব্যবহার করেও কীভাবে উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জন করা সম্ভব, নেদারল্যান্ডস তা করে দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ কনক। তিনি বলেন, দেশ এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং কম সম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে অধিক খাদ্য উৎপাদন করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তর গবেষক, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত।
নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন ও ফার্মারদের অভিজ্ঞতা
অনুষ্ঠানে লারিভ ইন্টারন্যাশনালের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রজিয়ার বেকার এবং ফিশটেক বাংলাদেশ লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ কারিগরি কর্মকর্তা (গবেষণা ও উন্নয়ন) ইমরান হোসেন ও সহকারী ব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম বিভিন্ন বিষয়ে উপস্থাপনা প্রদান করেন। এতে ‘ফুডটেক বাংলাদেশ’ প্রকল্পের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম ও রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম পদ্ধতির কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়।
প্রদর্শনীতে দেখানো হয়, এসব পদ্ধতির মাধ্যমে একই পানি পুনর্ব্যবহার করে কম জায়গায় কয়েক গুণ বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব, পাশাপাশি পানি ও খাদ্যের অপচয়ও কমে। কার্যক্রম দেখতে আসা তারাকান্দার বালিয়া গ্রামের মাছচাষি মাহবুব আলম ১৮ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, আধুনিক এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি ঘনত্বে মাছ চাষ করা সম্ভব। এটি এখনো খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। পদ্ধতিটি সহজলভ্য হলে খামারিরা অনেক বেশি লাভবান হতে পারবেন।
কার্যক্রম ঘুরে দেখার সময় মোহাম্মদ নুরুল আমিন খান নামের মাছচাষির সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মাছের খাবারের দাম বেড়েছে, কিন্তু মাছের দাম সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে লাভের পরিমাণ কমে গেছে। নতুন এই পদ্ধতিতে কম জায়গায় বেশি উৎপাদন সম্ভব, একই পানি বারবার ব্যবহার করা যায়। তাই আমার মনে হয়, এটি খামারিদের জন্য লাভজনক হবে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ফুডটেক বাংলাদেশের আওতায় ইতিমধ্যে ৬০টির বেশি প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অনলাইন ও সরাসরি মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মৎস্যচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খামার ব্যবস্থাপনার ‘অ্যাকুয়া কোচ’ নামে একটি ডিজিটাল অ্যাপও ব্যবহার করা হচ্ছে।
ফিশটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ তারেক সরকার বলেন, বাংলাদেশে মাছ চাষের জমি ক্রমেই কমছে, অথচ মাছের চাহিদা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পদ্ধতি ও যান্ত্রিক মৎস্য চাষের বিকল্প নেই। অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্সের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বল্প জায়গায় কম সময়ে বেশি ও মানসম্মত মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।
মোহাম্মদ তারেক সরকার আরও বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য বৈশ্বিক মান ও ভালো চাষপদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য খামারিদের প্রশিক্ষণ ও পদ্ধতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন বছরে প্রায় এক হাজার মাছচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিশটেক বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান

