কোরআনের অনুবাদক থেকে সুফিবাদের ভাষ্যকার
ক রআন র অন ব দক থ - উনিশ শতকের বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাসে গিরিশচন্দ্র সেনের অবদান অপরিসীম। সেই যুগে সাধারণ মানুষের পবিত্র কুরআনের বাণী নিজ ভাষায় পাওয়ার সুযোগ
Table of Contents
বাংলা ভাষায় কুরআনের প্রথম অনুবাদক ও সুফি ভাষ্যকার
Banglaprabah.com – ক রআন র অন ব দক থ – উনিশ শতকের বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাসে গিরিশচন্দ্র সেনের অবদান অপরিসীম। সেই যুগে সাধারণ মানুষের পবিত্র কুরআনের বাণী নিজ ভাষায় পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার বড় অংশ আরবি, ফারসি ও উর্দুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। ফলে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সাধারণের কাছে অনেকাংশেই অধরাই থেকে যেত। এই বাস্তবতায় একজন মানুষ নিজ জীবন উৎসর্গ করলেন ভাষার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে। ইতিহাসে তিনি ‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেন’ নামে পরিচিত। বাংলা ভাষায় কুরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক হিসেবে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
ধর্মীয় পরিবর্তন ও শিক্ষার সন্ধানে
১৮৭১ সালে কেশবচন্দ্র সেন ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর প্রভাবে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তীকালে গুরু কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহে তিনি ইসলামি সাহিত্য ও ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নে আত্মনিয়োগ করেন। আরবি ভাষা ও ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে ১৮৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে তিনি লক্ষ্ণৌ যান। সেই অধ্যয়নই পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলা ভাষায় কুরআন অনুবাদের মতো ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করার শক্ত ভিত তৈরি করে দিল।
কুরআন অনুবাদের ঐতিহাসিক যাত্রা
১৮৮১ সালে গিরিশচন্দ্র সেন পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদের কাজ শুরু করেন। সে সময়ে এটি ছিল এক সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। দীর্ঘ চার বছরের নিরলস সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি ১৮৮৫ সালে অনুবাদটি সম্পন্ন করেন। বাংলা ভাষায় এটিই ছিল কুরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ।
তৎকালীন সময়ে বহু আলেম ও আরবি-ফারসি শিক্ষিত ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন গিরিশচন্দ্র সেনকেই কুরআন অনুবাদের এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হলো? এ বিষয়ে উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমী (রহ.) (১৯০০-১৯৭২) তাঁর ‘বাংলা ভাষায় কুরআন পাকের অনুবাদ ও তফসীর’-এ তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন।
খ্রীষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মুহাম্মদ বিন্ বখতিয়ার কর্তৃক বঙ্গ-বিজয়ের বহু পূর্বেই আরব বণিক ও ধর্ম প্রচারকদের মারফত এতদঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটিলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলা ভাষায় ইসলামের মূল গ্রন্থ কুরআন পাকের (এভাবে হাদীসেরও) অনুবাদ কার্য সম্পাদিত হইয়াছিল বলিয়া এ যাবত জানা যায় না। ইহার কারণ প্রধানত তিনটি:
ক. ১৮৩৫ পর্যন্ত শিক্ষার বাহন আরবী ফারসী থাকা বিধায় ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানের শিক্ষিত লোক মাত্রেরই আরবী আর ফারসী জানা ছিল। আর আরবী ফারসীতে কুরআন পাকের বহু অনুবাদ ও তফসীর রহিয়াছে।
খ. এক শ্রেণীর মুসলমানের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, বাংলা ভাষায় কুরআন-হাদীসের অনুবাদ করা হইলে উহাদের পবিত্রতা নষ্ট হইয়া যাইবে এবং সাধারণের নিকট উহাদের মর্যাদার হানি ঘটিবে।
গ. কলিকাতার (বর্তমানে ঢাকার) আলিয়া মাদ্রাসা ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হইলেও ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত উহাতে বাংলা ভাষা শিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না। মাদ্রাসার ইংরেজ প্রিন্সিপাল এবং অবাঙ্গালী হেড মওলানা কখনও বাংলা ভাষার স্বীকৃতি দানে রাযী ছিলেন না। ঐচ্ছিক মাতৃভাষা হিসাবে উর্দুকেই করা হইয়াছিল পাঠ্য তালিকাভুক্ত। আর হিন্দুস্থান যাইয়া যাহারা ইলম শিক্ষা করিয়াছিলেন তাঁহাদের পক্ষে বাংলা ভাষা শিক্ষার কোন সুযোগই ছিল না। এ কারণে বাংলাভাষী আলিমগণ ছিলেন বাংলা ভাষার অনভিজ্ঞ।
মুদ্রণ ও প্রকাশনার ইতিহাস
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো গিরিশচন্দ্র সেন নিজেই ছাপাখানার মালিক ছিলেন। বাস্তবে তাঁর অনূদিত কুরআনের বিভিন্ন সংস্করণ বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। গিরিশচন্দ্র সেনের অনূদিত কুরআনের প্রথম খণ্ডের প্রথম সংস্করণে এক হাজার কপি মুদ্রিত হয়। এটি শেরপুরের ‘চারুযন্ত্র প্রেস’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী দুই খণ্ড কলকাতার ‘বিধানযন্ত্রে’ মুদ্রিত হয়।
এরপর ১৮৯২ সালে দ্বিতীয়, ১৯০৪ সালে তৃতীয় এবং ১৯৩৬ সালে চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এসব সংস্করণেও এক হাজার করে কপি মুদ্রিত হয়। তৃতীয় সংস্করণ কলকাতার ‘মঙ্গলগঞ্জ মিশন প্রেসে’ মুদ্রিত হয়। আর চতুর্থ সংস্করণ ‘নববিধান পাবলিকেশন কমিটি’-র উদ্যোগে কলকাতার ‘আর্ট প্রেস’ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।
ফারসি সাহিত্যের বাংলায় প্রকাশ
ইসলামি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ফারসি সাহিত্যের অমূল্য রত্নসমূহ বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তিনি দুই সংস্কৃতির মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করেন। শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’, জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনবি’, মহাকবি হাফিজের ‘দিওয়ান-ই-হাফিজ’ এবং হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর ‘কিমিয়ায়ে সাআদাত’-এর মতো কালজয়ী গ্রন্থের প্রথম বাংলা অনুবাদ তাঁর হাত ধরেই প্রকাশিত হয়। ফলে বাংলার পাঠকসমাজ ইসলামি ও ফারসি ভাবধারার গভীর সাহিত্যভান্ডারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
হাদিস, সিরাত, ইসলামের ইতিহাস, সুফিবাদ ও ফারসি সাহিত্যের বহু অমূল্য গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ ও মৌলিক রচনার অনন্য প্রয়াসের মাধ্যমে তিনি উনিশ শতকের বাংলা জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেন।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ক রআন র অন ব দক থ?
ক রআন র অন ব দক থ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ক রআন র অন ব দক থ matter?
ক রআন র অন ব দক থ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
