Uncategorized

সুরভীর সুন্দরবন: বাঘ–বিধবা থেকে বনবিবি

স রভ র স ন দরবন - অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামে বর্তমানে চলছে শিল্পী সোমা সুরভী জান্নাতের একক প্রদর্শনী। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে প্রাচীন পাবলিক জাদুঘর

Desk Uncategorized
Published July 24, 2026
Reading time 1 minutes
Conversation No comments
Foto : Linda Anderson - banglaprabah.com

সুরভীর সুন্দরবন: বাঘ–বিধবা থেকে বনবিবি

Banglaprabah.com – স রভ র স ন দরবন – অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামে বর্তমানে চলছে শিল্পী সোমা সুরভী জান্নাতের একক প্রদর্শনী। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে প্রাচীন পাবলিক জাদুঘর হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। এই সুযোগ তৈরি হয়েছে ঢাকা আর্ট সামিটে তাঁর অর্জিত পুরস্কারের মাধ্যমে। ২০২০ সালে সেখানে সামদানি আর্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন তিনি। জুরি কমিটির মতে, তাঁর ‘অতি উদ্ভাবনী রেখাচিত্র, স্থাপনা ও চিত্রকলার চর্চা’র জন্য এই সম্মাননা।

সুরভীর শিল্পচর্চার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁর সৃষ্টি একদিকে যেমন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, অন্যদিকে সমাজ-সচেতনও। ক্যানভাসের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি গল্প বলার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এমনকি স্টুডিওর দেয়ালও তাঁর কাজের জন্য যথেষ্ট নয়।

গন্তব্য নয়, পথই মনজিল।

সুফি দর্শনের এই কথা শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মনে হয় সুরভীর। তাঁর যাত্রার কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই, কোনো সীমাও নেই। তবে বর্তমানে এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানাঙ্ক হলো অক্সফোর্ডের সেই প্রাচীন জাদুঘর।

রেসিডেন্সি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ঢাকা আর্ট সামিটের পুরস্কার আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর কাজের পরিচয় বাড়ায়। সেই সুযোগে অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামে কয়েকজন গবেষণাকারী শিক্ষার্থী তাঁর নাম প্রস্তাব করেন রেসিডেন্সি কর্মসূচির জন্য। নানা যাচাই-বাছাইয়ের পর সুরভী ‘আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্সি’ হিসেবে নির্বাচিত হন।

এই রেসিডেন্সিতে জাদুঘরের শিল্পসংগ্রহ শিল্পীদের সামনে তুলে ধরা হয়। এটি কেবল গ্যালারির কাঁচের আড়ালে থাকা শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ নয়। অংশগ্রহণকারীরা স্টাডিরুম ও সংরক্ষণাগারেও প্রবেশাধিকার পান। লক্ষ্য হলো—শিল্পীরা ঐতিহাসিক সংগ্রহ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন।

সুরভী এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর কাছে শৈল্পিক কোনো প্রক্রিয়াই জটিল নয়। দরকার ধীরতা ও স্থিরতা। মিউজিয়ামের শিল্পকর্ম থেকে আইডিয়া নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সেই নীতিতেই স্থির থেকেছেন। সমস্ত সময় তিনি নিবিড়ভাবে শত শত মিনিয়েচার, পেইন্টিংস, ভাস্কর্য ও সিরামিকসের কাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি যেন শিল্পসমুদ্র মন্থন করে অমৃত লাভের চেষ্টা।

অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টির সম্পর্ক

একজন শিল্পী যা সৃষ্টি করেন, তা তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরের কিছু নয়। তা দেখার, শোনার, পাশোনার, জীবনযাপনের, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বা ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের কিংবা স্বপ্ন-কল্পনা যা-ই হোক না কেন। সুরভীর সৃষ্টিও তাঁর অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা বা কল্পনারই ফল।

ঢাকার চারুকলা থেকে অনার্স করার পর তিনি মাস্টার্স করেছেন বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনে। সেখানে তিনি প্রকৃতির কাছাকাছি থেকেছেন, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসেছেন। মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণীর মধ্যের সম্পর্ক এবং এসব নিয়ে আগ্রহ তাঁর মধ্যে নতুন চিন্তা ও বোধের জন্ম দিয়েছে। মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের চোখ দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি দেখি। প্রাণীরা কীভাবে দেখে? কী দেখে? একজন শিল্পীর মনেই তো এমন ভাবনা ও কৌতূহলের জন্ম নেবে। সুরভীর ভাবনা ও কল্পনার জগতে এই বিষয়গুলো নানাভাবে ঘুরেফিরে এসেছে।

প্রদর্শনী ও থিম

রেসিডেন্সিতে থাকার সময় মিউজিয়ামের শিল্পসংগ্রহ থেকে তিনি তাঁর মতো করে বেছে ও ছেঁকে মাথায় নিয়েছেন অনেক কিছু। তা প্রতীক, রং বা আঁকার স্টাইল, যা-ই হোক না কেন। ফিরে এসে তিনি কিছু কাজ করেছেন, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই রেসিডেন্সির অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়েছে। এই কাজগুলোর কয়েকটি শ্রীলঙ্কার কনটেমপোরারি আর্ট ফেস্টিভ্যাল ‘কলম্বোস্কোপ’-এ প্রদর্শিত হয়।

কাজগুলো দেখে আগ্রহী হয়ে ওঠেন অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামের সাউথ এশিয়ান আর্ট বিভাগের কিউরেটর অধ্যাপক মল্লিকা কুম্বেরা ল্যান্ড্রাস। তিনি সরাসরি শ্রীলঙ্কায় এসে কাজগুলো দেখেন এবং বুঝতে পারেন যে অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামের সংগ্রহ সুরভীর ভাবনা ও শিল্পচর্চার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এর ভিত্তিতেই অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামে সুরভীর একক প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রতি বিষয় প্রাণ, প্রকৃতি ও মানুষ বা এর পারস্পরিক সম্পর্ক—এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি প্রদর্শনীর মূল থিম হিসেবে বেছে নেন সুন্দরবনকে। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে আঁকা ছবিগুলো নিয়েই তিনি হাজির হন প্রদর্শনীতে। রেসিডেন্সিতে শিল্পসংগ্রহ নিয়ে তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও কাজ করার অভিজ্ঞতাও ঋদ্ধ হয়েছে তাঁর ‘ক্লাইমেট কালচার কেয়ার’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি। কয়েকটি সিরিজে সুরভীর মোট ২২টি কাজ রয়েছে প্রদর্শনীতে।

এর মধ্যে একটি কাজ ‘ইন আ টাইমলেস সুইট ল্যান্ড’ পুরোনো। সুরভীর গ্রামের বাইরে লালমনিরহাটে। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল সেখানে। ছবিটি সেই সব স্মৃতি নিয়ে আঁকা। খাবারের টেবিলে মা আর তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে। পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে ছবিজুড়ে। এর চারপাশ ঘিরে রেখেছে শৈশবের মুক্ত জীবনের নানা নস্টালজিক স্মৃতি। বাকি সব কাজ রেসিডেন্সিতে বিভিন্ন কাজ দেখা এবং সেখান থেকে নানা ‘অনুপ্রেরণা’ নেওয়ার পর আঁকা।

Leave a Comment