মার্কিন-সৌদি পারমাণবিক চুক্তি: ইসরায়েলের উদ্বেগ
Banglaprabah.com – স দ আরব র সঙ গ য – যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বড় ধরনের পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি দুই দেশের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। নতুন এই চুক্তি কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সুযোগ ও ওয়েস্টিংহাউসের ভূমিকা
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে কয়েক শ কোটি ডলারের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে। প্রথমেই এর সুফল পেতে পারে ওয়েস্টিংহাউস। মার্কিন কোম্পানিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হওয়া অনেক পারমাণবিক চুল্লির নকশা তৈরি করে থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর শিগগিরই মার্কিন কংগ্রেসের সামনে এটি বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে।
চুক্তিটি রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যের সমর্থন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের উদ্বেগ ও পরিদর্শকদের ক্ষমতা
তবে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে সৌদি আরব ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ট্রাম্প এমন কিছু শর্তে সম্মত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। এর ফলে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা থেকে অস্ত্র তৈরির কাজে পারমাণবিক জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করাটা পরিদর্শকদের জন্য কঠিন হতে পারে।
ইসরায়েল স্বীকৃতির শর্ত ও সময়ের পরিবর্তন
এ চুক্তি নিয়ে কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছিল। জো বাইডেন প্রশাসনের সময় এটি একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এর শর্ত ছিল—সৌদি আরব ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে যায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাব থেকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্তটি সরিয়ে দেন।
কংগ্রেসের পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে এটিকে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেস চাইলে এর বিরুদ্ধে আপত্তির প্রস্তাবে ভোটাভুটি করতে পারে। তবে চুক্তিটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে হলে কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে। তবু এ চুক্তি নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিয়ে সমীক্ষা করার বিষয়েও সম্মত হয়েছেন ট্রাম্প। ওই সমীক্ষার পর সৌদি আরবকে নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে একই ধরনের একটি চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই চুক্তির শর্ত ছিল অনেক বেশি কঠোর। আমিরাত কর্তৃপক্ষ তখন ওই দেশে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের কাজ করতে দিতে সম্মত হয়েছিল। এ জন্য সংস্থাটির সঙ্গে ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ নামে পরিচিত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আরব আমিরাত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন, সে খবর গতকাল রাতে প্রথম প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর আগে বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও তা করবে। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে সৌদি আরব এটা করবে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালাচ্ছে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনামলে করা ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী মানের কাছাকাছি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে। ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। গত বছরের নভেম্বরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হোয়াইট হাউস সফর করেন। ওই সময় ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন। এর পর থেকেই দুই দেশের কর্মকর্তারা এ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়েছেন।

