নজরুল ইসলামের সাকার, আকার ও নিরাকার
নজর ল ইসল ম র স ক - কাজী নজরুল ইসলামের শততম জন্মদিন পেরিয়ে ২০০০ সালের ২৬ মে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীর আয়োজনে সলিমুল্লাহ খানের এ প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত
Table of Contents
Banglaprabah.com – নজর ল ইসল ম র স ক – কাজী নজরুল ইসলামের শততম জন্মদিন পেরিয়ে ২০০০ সালের ২৬ মে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীর আয়োজনে সলিমুল্লাহ খানের এ প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তখনো প্রথম আলোর অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি। তাই এত দিন লেখাটি শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়েই ছিল। আজ অন্য আলো অনলাইন পাঠকের কাছে প্রথমবারের মতো তুলে ধরা হলো।. আল্লা কে বোঝে তোমার অপার নীলে আপনি আল্লা ডাক আল্লা বলে।। নিরাকারে তুমি নূরী ছিলে ডিম্ব অবতারি সাকারে সৃজন গঠলেন ত্রিভুবন আকারে চমৎকার ভাব দেখালে।। —লালন ১৪০২:১ এই প্রবন্ধের নামে ব্যবহৃত ‘সাকার’, ‘আকার’ ও ‘নিরাকার’ শব্দ তিনটি ফকির লালন শাহের গান থেকে নেওয়া। এই তিন শব্দকে ফরাশি দার্শনিক জাক লাকাঁ প্রবর্তিত তিন শব্দ—যথাক্রমে ‘ইমাজিনারী’, ‘সিম্বলিক’ ও ‘রিয়েল’—এর তর্জমা হিশেবেই গ্রহণ করা যায়। লাকাঁর মতে, ‘ইমাজিনারী’ শব্দটির মূলে আছে ‘ইমেজ’ বা ছবি। মূর্তিও বলতে পারি বাংলায়। ‘ইমাজিনারী’র অপর অর্থ—মনগড়া বা কাল্পনিক—থেকেও আমরা কিছু ইশারা পেতে পারি। সব মিলিয়েই সাকার। অপর দিকে ভাবের প্রকাশ আকারে, অক্ষরে, শব্দে। ভাব শব্দে আজকাল ইংরেজি ‘আইডিয়া’ বোঝায়; ভাবের আদি অর্থ ইংরেজি ‘বিয়িং’। সেই আদ্যের ‘ভাব’ অর্থে আকার বা প্রতীক রূপ গ্রহণ করে। কিন্তু খোদ ‘ভাব’ আদপে অপ্রকাশ্য বা নিরাকার। ছবিতে বা অক্ষরে যখনই ভাবের প্রকাশ হয় তখনই নিরাকারের অবসান। এই অর্থে নিরাকার মানে যার আকার অসম্ভব। একেই জাক লাকাঁ বলেন—রিয়েল। যথা—মৃত্যু বা ঈশ্বর।. নজরুল ইসলামের রচনায় ‘আল্লাহ’ ও ‘রসুল’ শব্দ দুটির চলন ও গড়ন পর্যালোচনা করে আমরা সাকার, আকার ও নিরাকারের অর্থ দেখাবার চেষ্টা করব। এই প্রবন্ধের মূল প্রস্তাবও তা-ই। জাক লাকাঁর প্রস্তাব মোতাবেক শব্দ মাত্রেই আকার বা সিম্বল। এবং—তাঁর মতে—শব্দের অর্থ কেবল শব্দের ভেতরে থাকে না, থাকে তার চারপাশে, বাইরে সমগ্র ভাষাজুড়ে। ভাষার সমস্ত এলাকা থেকেই শব্দ আপনার অর্থ কুড়িয়ে আনে। অভিধানের প্রত্যেকটি শব্দের ব্যাখ্যা অভিধানের ভেতরের আর সমস্ত শব্দের ওপর ভর করে। এই অর্থেই শব্দকে বলা হয় ‘সিগনিফায়ার’ বা অর্থপতি। কারণ শব্দের অর্থ স্থির নয়, চলিষ্ণু—নির্ধারিত নয়, নির্ধারক। পুরানা যুগের পণ্ডিতরা শব্দকে ‘সাইন’ বা অর্থের বাহক বলতেন। সেই ধারণা এখন অচল, বাতিলযোগ্য। পুরোনো ধারণা মোতাবেক শব্দ কোনো কোনো বস্তু বা ধারণার প্রতিনিধি মাত্র। নতুন ধারণা অনুসারে তা ঠিক নয়। শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক থেকেই ভাষায় অর্থের সঞ্চার। আধুনিক ভাষাবিদ্যার এটাই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। নজরুল ইসলামের কয়েকটি গানে ‘আল্লাহ’ ও ‘রসুল’ শব্দের ব্যবহার কোনো কোনো অর্থে শব্দের এই সার্বভৌম বা অর্থপতি চরিত্র প্রকটিত করে—তা দেখানোই আমার ইচ্ছা। জাক লাকাঁর প্রস্তাব অনুসরণ করে বলা যায়, ভাষার সকল শব্দ দুই প্রস্ত নিয়মের অধীন। কখনো এক শব্দকে সরিয়ে বা দাবিয়ে দিয়ে আর শব্দ তার জায়গা নেয়। এতে অর্থ বাড়ে, বা কমেও হয়তোবা। এই নিয়মের নাম মেটাফর বা রূপান্তর। বাংলায় এর নাম ‘রূপক’। ভাষায় শব্দ গড়বার দ্বিতীয় নিয়মের নাম মেটোনিমি বা নামান্তর। পুরোনো বাংলায় ‘লক্ষণা’ হিসেবেই এর পরিচয়। এক শব্দ গড়িয়ে আর শব্দের অর্থ গ্রহণ করে বা এক শব্দকে ঠেলে সরিয়ে আর শব্দের অভিষেক হয়। এইভাবে অর্থের গতি বিধান করাই লক্ষণার প্রধান লক্ষণ। রূপক আর লক্ষণা—মেটাফর ও মেটোনিমি—ব্যাকরণের দুই অলংকার মাত্র নয়—ভাষার সমগ্র অস্তিত্ব, সকল শব্দই এই দুই নিয়মের অধীন। জাক লাকাঁর এই তাত্পর্যপূর্ণ প্রস্তাবের পেছনে ভাষাবিদ্যা ও মনো-বিশ্লেষণ বিদ্যার সমর্থন আছে। রোমান ইয়াকবসন ও সিগমুন্ড ফ্রয়েডের রচনা পড়েই লাকাঁ তাঁর মতে পৌঁছান বলে আমরা জানি। ফ্রয়েডের জগদ্বিখ্যাত বই খোয়াবনামা (বা স্বপ্নের ব্যাখ্যা) এই বিষয়ের প্রথম সূত্রপাত করে। স্বপ্নের মধ্যে আমরা সিনেমার পর্দার মতো যে ছবি দেখি, তা ফ্রয়েডের চোখে ভাষার মতো পাঠযোগ্য। তার এক একটা অংশ অন্যান্য অংশের সঙ্গে দুই নিয়মে সম্পর্কিত। একটির নাম কনডেনসেশন বা ঘনা। এটি রূপকের কাছাকাছি প্রক্রিয়া। অপরটির নাম ডিসপ্লেসমেন্ট বা ঠেলা। এটি মেটোনিমির আত্মীয়া।.
২. নজরুল ইসলামের গানের একটি খুদে সংগ্রহ থেকে আমি আমার দরকারি উদাহরণ জোগাড় করেছি। (নজরুল ১৩৯৫) এই জাতীয় আলোচনার যদি প্রয়োজন আরও দেখা দেয়, তো মেসাল আরও দেওয়া যাবে। ‘আল্লাহ’ ও ‘রসুলের’ কথা বলতে নজরুল নানান ধরনের রূপক ও লক্ষণার শরণ নিয়েছেন। কল্পনার এই বিচিত্র স্ফূর্তি, রূপক ও লক্ষণার এই বিপুল আরোহ, চলতি ন্যায়বিদ্যার মাপে কখনো দুর্বোধ্য, কখনোবা অবোধ্য ঠেকে। আমার প্রস্তাব—ফ্রয়েডের অমর আবিষ্কার ‘দি আনকনসাস’ বা অজ্ঞাতসারকে যদি আমরা এই স্ফূর্তির আদি উত্স ধরে নিই তো একপ্রকার রাহা হয় এই সমস্যার। এই প্রবন্ধে তার ইশারা মাত্র করা গেল। বিস্তারের জন্য কিছু পরিসর চাই। আজ তা স্থগিত থাক। নজরুলের এই দুটি চরণ বিবেচনা করা যাক: ইসলামের ঐ বাগিচাতে ফুটলো দুটি ফুল/ শোভায় অতুল সে ফুল আমার আল্লা ও রসুল। (নজরুল ১৩৯৫:৩২) এই রূপকে আল্লাহ ও রসুল সমতুল। তবে আরেক রূপকে নজরুল ইসলাম আল্লাহকে তরু আর রসুলকে ফুল বলেছেন: আল্লাহ রসুল তরু আর ফুল প্রেমিক-হৃদয় জানে/ কেহ বা তরুরে ভালোবাসে ভাই, কেহ ফুল ধরে টানে। (নজরুল ১৩৯৫:২৬) আরেক রূপকে নজরুল আল্লাহকে বলেছেন ‘বীজ’ আর রসুলকে বীজ পুঁতবার যে জমি তার ‘পত্তনীদার’ নাম দিয়েছেন।. *(আমি) আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি* এবার মনের মাঠে/ ফলবে ফসল, বেচব তারে কেয়ামতের হাটে।/ পত্তনীদার যে এই জমির/ খাজনা দিয়ে সেই নবীজীর/ বেহেশতেরই তালুক কিনে ব’সব সোনার খাটে।। (নজরুল ১৩৯৫:২২) ইসলামের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহ নিরাকার। তিনি কারও জন্মের কারণ নন, কেউ তাঁকে জন্মও দেন নাই। তথাপি ভাষায় তিনি একটা আকার হিশেবে—শব্দ আকারে—হাজির। তাঁর প্রকাশ ‘আল্লাহ’ নামে। নাম মাত্রেই আকার বা প্রতীক এইটুকু মনে রাখা বাঞ্ছনীয় এইখানে। নিরাকার, নিরঞ্জন ঈশ্বরের কথা দুনিয়ার আরও পাঁচ ধর্মশান্ত্রে আছে। কথা মাত্রেই যখন আকার তখন ঈশ্বর, আল্লাহ বা ইয়াহবেহ—যা’ই উচ্চারণ করি না কেন, উচ্চারণ মাত্রেই আকারের উদ্ভব এবং নিরাকারের অবসান। নিরাকারে তুমি নূরী ছিলে ডিম্ব অবতারি—এই যুক্তি অনুসারে নিরাকার ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকে ‘আকার’ স্বরূপ ঈশ্বরের (অর্থাৎ ঈশ্বর শব্দের) উদ্ভব নয়। ব্যাপার বরং অন্য। ‘ঈশ্বর’ শব্দ থেকেই ‘নিরাকার ঈশ্বর’ নামক ধারণার বা মানস-ছবির বা অর্থ—পরিবারের বপন। অর্থ-পরিবার কথাটা আমি ইংরেজি ‘সিগনিফায়েড’ শব্দের তর্জমাস্বরূপ লিখলাম। বপনের ইংরেজি এখানে প্রিসিপিটেশন। শব্দ হিশেবে ঈশ্বর আকারস্বরূপ, যা সিম্বলিক এবং সেই শব্দকেন্দ্রিক যে জগৎ তার নাম আকার জগৎ বা সিম্বলিক অর্ডার। ভারতবর্ষাদি দুনিয়ার আর যে পাঁচ মুলুকে মূর্তি বা বিগ্রহ পূজার চল আছে তাতে দেখা যায়, ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা সেখানে দুই মাত্রার ছবি কিংবা তিন মাত্রার মূর্তিতে সাকার হয়েছে। জাক লাকাঁ কথিত ‘ইমাজিনারী’ এবং ফকির লালন প্রবর্তিত ‘সাকার’ এই পরিস্থিতিরই ইঙ্গিতবহ। ইসলামের শাস্ত্র ছাড়িয়ে নজরুল ইসলাম সাকারে পৌঁছেছেন কিভাবে, তা আমরা ওপরের কয়েক চরণে দেখলাম। আরও একটু দেখার আছে এক্ষণে। আল্লাহ ও রসুলের তাত্পর্য আলাদা। শাস্ত্র অনুসারে আল্লাহকে বড়জোর আকারে প্রকাশ করা যায়, কিন্তু মানুষ ‘রসুল’ যদ্দিন জীবন ধারণ করতেন, তত দিন তো সাকার ছিলেন। নবীর হাদিস অনুসারে জানা যায়—তিনিও মানুষ ছিলেন, পার্থক্যের মধ্যে—তাঁর কাছে আল্লাহর ওহী আসতেন। নজরুল নবীর সাকার রূপ বন্দনায় বৈষ্ণব ভাবধারায় আপন্ন: আল্লাহ থাকেন দূর আরশে নবীজি রয় প্রাণের কাছে/ প্রাণের কাছে রয় যে প্রিয়/ সেই নবীরে পরাণ যাচে/ পয়গম্বরও পায় না খোদায়/ মোর নবীরে সকলে পায়/…
../খোদার নামে সেজদা করি/ নবীরে মোর ভালবাসি/ খোদা যেন নূরের সুরয/ নবী যেন চাঁদের হাসি।/ নবীরে মোর কাছে পেতে/ হয় না পাহাড়-বনে যেতে/ বৃথা ফকির দরবেশ মরে/ পুড়ে খোদার আগুন-মাঝে।। (নজরুল ১৩৯৫:৩০) নজরুল ইসলামের ইমাজিনারী বা সাকার বন্দনা বৈষ্ণব কবির সাকার-নিষ্ঠার আকার গ্রহণ করে। ইসলামের পয়গম্বরকে আকার জগৎ বা বিধানের পতি হিশেবে নেওয়ার পরিবর্তে সাকার জগৎ বা প্রেমের গৌরাঙ্গ হিশেবে নেওয়া সাহসের ও সত্যের প্রমাণ। নজরুল গেয়েছেন:. যে রসুল বলতে নয়ন ঝরে/ সেই রসুলের প্রেমিক আমি/ চাহে আর আমার হৃদয়-লায়লী/ সে মজনুরে দিবস-যামী/ ফরহাদ সে, আমি শিরী… (নজরুল ১৩৯৫:৯৬) নজরুলের রসুল বর্ণনা মনোহর। তার বড় রূপক চাঁদ। পয়গম্বর সাহেবের কায়িক সৌন্দর্য এই রূপকে প্রকটিত: নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া/ কে এল মক্কায় আমিনার কোলে/ ফাগুন-পূর্ণিমা-নিশীথে যেমন/ আসমানের কোলে রাঙা-চাঁদ দোলে। (নজরুল ১৩৯৫:৭৬) আরও মজার রূপক সওদাগর, দুলা এবং রাখাল। নজরুল লিখেছেন: ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবী সওদাগর/ বদনসীব আয়, আয় গুনাহগার, নতুন করে সওদা কর/…/আরশ হতে পথ ভুলে এ এল মদিনা শহর/ নামে মোবারক মোহাম্মদ, পুঁজি ‘আল্লাহু আকবর’। (নজরুল ১৩৯৫:৩৩) কিংবা, আরেকবার যেমন বলেছেন নজরুল: মদিনাতে এসেছে সই নবীন সওদাগর/ সে হীরা জহরতের চেয়ে অধিক মনোহর। (নজরুল ১৩৯৫:৮৬) অন্যত্র, নবীর রূপ দুলার মতন: দেখে যা রে দুলা সাজে সেজেছেন মোদের নবী/ বর্ণিতে সে-রূপ মধুর হার মানে নিখিল-কবি।। (নজরুল ১৩৯৫:৭০) নজরুলের রসুল বন্দনা শাস্ত্রের মুখাপেক্ষী নয়। নবী জীবনী আর বৈষ্ণব কাহিনী খানিক মিশিয়ে নজরুলের সাকার নবী মূর্তি গ্রহণ করেন: মেষ চারণে যায় নবী কিশোর রাখাল বেশে/ নীল রেশমী রুমাল বেঁধে চারু চাঁচর কেশে/ তাঁর রাঙা পদতলে পুলকে ধরা টলে/ তাঁর রূপ লাবণির ঢলে মরুভূমি গেল ভেসে।। /তার মুখে রহে চাহি’ মেষ শিশু তৃণ ভুলি’/ বিশ্বের শাহানশাহ আজ মাখে গোঠের ধূলি।/ তাঁর চরণ-নখরে কোটি চাঁদ কেঁদে মরে/ তাঁর ছায়া ক’রে চলে আকাশের মেঘ এসে।/ কিশোর নবী গোঠে চলে—/ তাঁর চরণ-ছোঁওয়ায় পথের পাথর মোম হয়ে যায় গ’লে।/ তসলিম জানায় পাহাড়/ চরণ ঝুঁকে তাঁহার,/ নারঙ্গী আঙ্গুর খজ্জুর পায়ে নজরানা দেয় হেসে।। (নজরুল ১৩৯৫:৯০).
৩. নজরুল ইসলাম রসুল বন্দনায় বেশির ভাগ সাকারের আশ্রয় নিয়েছেন। এ কথা সত্য। তবে সাকারের সঙ্গে শুদ্ধ আকার বন্দনায়ও তার যাওয়া কম নয়। বলা যায়—এই আকার থেকেই সাকারের যাত্রা। নজরুল বলেন: ও নামে রওশন জমীন আসমান/ ও নামে মাখা তামাম জাহান/ ও নাম দরিয়ায় বহায় উজান/ ও নাম ধেয়ায় মরু ও পর্বত/ আমার নবীর নাম জপে নিশিদিন/ ফেরেশতা আর হুরী-পরী জিন/ ও নাম যদি আমার ধ্যানে বয়/ পাব কিয়ামতে তাহার শাফায়ত।। (নজরুল ১৩৯৫:১৯) নবীর নামকে নজরুল ইসলাম নতুন ব্যঞ্জনা দেন। নামের এই আকার ভাবের সাকার রূপে প্রকাশ পায়। পুরো গানটি তুলে দিতে পারি এই প্রয়োজনে: হে প্রিয় নবী, রসুল আমার!/ পরেছি আভরণ নামেরই তোমার/ নয়নের কাজলে তব নাম/ ললাটের টিপে জ্বলে তব নাম/ গাঁথা মোর কুন্তলে আহমদ/ বাঁধা মোর অঞ্চলে তব নাম।/ দুলিছে গলে মোর তব নাম মণিহার।।/ তাবিজ অঙ্গুরী তব নাম,/ বাজু ও, পৈ’চী চুড়ি তব নাম।/ ভয়ে ভয়ে পথে পথে ঘুরি যে/ পাছে কেউ করে চুরি তব নাম/ ঐ নাম রূপ মোর ঐ নাম আঁখি-ধারা।।/ বুকের বেদনা ঢাকা তব নাম।/ প্রাণের পরতে আঁকা তব নাম,/ ধ্যানে মোর জ্ঞানে মোর তুমি যে,/ প্রেম ও ভক্তি মাখা তব নাম’/ প্রিয় নাম আহমদ জপি আমি অনিবার।। (নজরুল ১৩৯৫:১০৭) এই ধ্যানের আকার খুব অল্প আয়াসেই নজরুলের চোখে রূপের লহর তুলে নাচে: আমিনার কোলে নাচে হেলে দুলে/ শিশু নবী আহমদ রূপের লহর তুলে/ রাঙা মেঘের কাছে ঈদের চাঁদ নাচে/ যেন নাচে ভোরে আলো গোলাব গাছে/ চরণে ভোমরা গুঞ্জরে গুল ভুলে।। (নজরুল ১৩৯৫:২৫) এই নাম সংকীর্তন শুধু রসুলের নয়—আল্লাহরও। নজরুল বলেন, ‘শত ঈদের চাঁদও দিতে নারে আল্লাহ নামের দাম।।’ (নজরুল ১৩৯৫: ৯০) আল্লাহ ও রসুল নামের একত্র বন্দনায় আবারও দামের প্রশ্ন: (মোরা) রসুল নামের ফুলে এনেছি রে/ আয় গাঁথবি মালা কে?/ এই মালা নিয়ে রাখবি বেঁধে/ আল্লাহতালাকে।// অতি অল্প ইহারই দাম/ শুধু আল্লা রসুল নাম/ এই মালা প’রে দুঃখ-শোকের/ ভুলবি জ্বালাকে।।(নজরুল ১৩৯৫:৯১). ৪.
আমরা দেখলাম, রূপকের নিয়মই নজরুল ইসলামের প্রধান প্রবণতা। এই লক্ষণকে ইয়াকবসন রোমান্টিক কবিতার বৈশিষ্ট্য মনে করেন। তাঁর মতে গদ্যের—বিশেষত উনিশ শতকীয় ইউরোপীয় বর্ণনামূলক গদ্যের—স্বাতন্ত্র্য লক্ষণার ব্যবহার। নজরুলের কোনো কোনো রচনায় শব্দের নামান্তর বা লক্ষণার আবির্ভাব দেখতে পাওয়া কঠিন নয়। নজরুল দেখিয়েছেন কী সহজে নবীর নাম ‘আহমদ’, আল্লাহর নাম ‘আহাদের’ লক্ষণা হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে নজরুল মৌলিক এই দাবি আমি করছি না। লালন ফকিরও একই লক্ষণার শরণ নিয়েছেন বহু আগেই। নজরুলের লক্ষণা তবুও স্বতন্ত্র। মিম হরফ না থাকলে যে আহদ/ নামে মাখা যাঁর শিরীন শহদ/ নিখিল প্রেমাস্পদ আমার মোহাম্মদ/ ত্রিভুবন উজালা।। (নজরুল ১৩৯৫:৩১) কিংবা আহমদের ঐ মিমের পর্দা/ উঠিয়ে দেখ্ মন/ আহাদ সেথায় বিরাজ করেন/ হেরে গুণীজন।।(নজরুল ১৩৯৫:৩১) ফকির লালন শাহের গানেও আমরা একই লক্ষণার আনাগোনা দেখি। লেখার সীমা যেন না বেড়ে যায় তাই আমি নজির কমিয়ে দেব। লালন বলেন: আহাদে আহাম্মদ এসে/ নবী নাম তাই জানালে/ নবী যে তনে করিল সৃষ্টি/ সে তন কোথায় রাখিলে।/ আহাদ নামে পরোয়ার/ আহাম্মদ রূপে সে এবার/ জন্ম মৃত্যু হয় যদি তার/ শরার আইন কই চলে।। (লালন ১৪০২: ১৩) ৫. নজরুল ইসলাম আল্লাহর রসুল মোহাম্মদকে কল্পনা করেছেন সাকারে—নানান রূপকে, বিচিত্র বেশে। তাঁকে ডেকেছেন ‘মদিনার বুলবুলি’, ‘মদিনার নাইয়া’, ‘মদিনাবাসী প্রেমিক’, ‘কাণ্ডারী’, ‘দীনের বাদশা’, ‘মদিনা-দুলাল’, ‘কিশোর-রাখাল’, ‘তরুণ প্রেমিক’ ও ‘শিশু ইসলাম’ প্রভৃতি অপরূপ নামে বলেছেন তাঁকে ‘আমিনা-লালা’, ‘গুলে-লালা’, ‘কমলীওয়ালা’, ‘ঈদের চাঁদ’, ‘সোনার চাঁদ’ এবং ‘আল-আরাবী সাকী’ ইত্যাকার বিচিত্র রূপে। নবীজি নজরুলের চোখে:. মদিনার শাহানশাহ কোহ-ই-তুর-বিহারি/ মোহাম্মদ মোস্তাফা নবুয়তধারী।।/ আল্লার প্রিয় সখা, দুলাল মা আমিনার,/ খাদিজার স্বামী, প্রিয়তম আয়েশার/ আসহাবের হাম্দম, ওয়ালেদ ফতেমার/ বেলালের আজান, খালেদের তলোয়ার/ কেয়ামতে উম্মত শাফায়তকারী।। (নজরুল ১৩৯৫:৮৭) এবং তাঁর উপসিদ্ধান্ত: (আছে) আল্লা আমার মাথার মুকুট/ রসুল গলার হার। (নজরুল ১৩৯৫: ৭২) তাঁর সিদ্ধান্ত ‘আল্লাহ’, ‘রসুল’ ব্যবসায় তিনিও শরীক হবেন: আমি বাণিজ্যেতে যাব এবার মদিনা শহর/ আমি এ দেশে হায়, গোনাহগারি ছিলাম জীবন ভর।।/ পাঞ্জেগানার বাজার যেথা বসে দিনে রাতে/ দু’টি টাকা ‘আল্লাহ’ ‘রসুল’ পুঁজি নিয়ে হাতে/ কত পথের ফকির সওদা করে হ’ল সওদাগর। (নজরুল ১৩৯৫: ২২-২৩) সাকারে যে ভালোবাসার চাহিদা তার সীমা আছে। কিন্তু আকারে অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা পরিণত হয় শুদ্ধ বাসনায়। এই বাসনার শেষ কোথায়?
কেউ জানে না। এই অজানারই অপর নাম বেহেশতী আরাম। প্রয়োজন যদি যুক্ত হয় নিরাকারের সঙ্গে এবং চাহিদার সম্পর্ক সাকারের সঙ্গে তবে বাসনার দীপশিখা শুধু জ্বলে নামের মহিমায়—আকারেই শুধু বাসনার ভাষা পরিণতি পায়: ফেরি করি ফিরি আমি/ আল্লাহ নবীর নাম।/ দেশ-বিদেশে পথে-ঘাটে/ হাঁকি সুবহ-শাম।/ কলমা শাহাদাতের বাণী/ যে বারেক বলে একটুখানি,/ সে চাওয়ার অধিক দেয় আমারে/ মোর সওদার দাম।। / দাম দিয়ে সব দুনিয়াদারীর/ দামী জিনিস চায়/ অমূল্য এই আল্লারই নাম/ কেউ চাহে না হায়!/ আল্লাহ নামের ফেরিওয়ালায়/ ডাকে ওরা শেষের বেলায়,/ ঐ নাম দিয়ে সে আখেরে পায়/ বেহেশতী আরাম।। (নজরুল ১৩৯৫: ৭৯-৮০). আকার ও সাকার চাহিদা ও বাসনার দুই লক্ষ্য। আকার, সাকার ও নিরাকার এই তিন নিয়ে আমাদের জগৎমালা। এই তিনের সম্পর্ক এমন যে একটিকে বাদ দিলে তিনটিই অচল। বাসনার নির্বাপণ হয় না নিতান্ত সাকার বা খামকা আকারনিষ্ঠায়। প্রাণ চায় নিরাকার নিরঞ্জন। কিন্তু প্রাণের সেই চাওয়া কখনোই পূর্ণ হবার নয়। নিরাকার মানে সত্য-স্বরূপ, কিন্তু সে সত্য অপ্রকাশ্য। কিংবা—জাক লাকাঁ যেমন বলেন—নিরাকার মানে না-থাকা, অসম্ভব থাকা। দি রিয়েল ইজ ইমপসিবল। আকার ও সাকারকে যদি নিরাকার নিরঞ্জনের দুই রকম প্রকাশ ধরি আমরা তবে নিরাকারের গূঢ় অর্থ প্রকাশিত হয়। নিরাকার যদি না থাকে তো আকারও সাকার অর্থ হারায়। এখানেই নিরাকারের তাত্পর্য। এই তাত্পর্য বাদ দিলে ঈশ্বর ও নিরীশ্বর অভেদ। ঈশ্বর শব্দের ভেতর যে আকার উপস্থিত তার পরিবার কোথায়? সেই পরিবারের নাম ‘অজ্ঞাতসার’। অথবা লালন ফকির যাকে বলেছেন ‘অচিন দেশ’। নজরুল ইসলামের নিরাকার বাসনায় সেই অজ্ঞাতসারের ভেতরে থাকে। তোমারি প্রকাশ মহান এ নিখিল দুনিয়া জাহান। তোমারি জ্যোতিতে রওশন নিশিদিন জমীন ও আসমান।। নিভিল কোটি তপন চাঁদ খুঁজিয়া তোমারে প্রভু। কত দাউদ ঈশা মুসা করিল তব গুণগান।। তোমারে কত নামে হায় ডাকিছে বিশ্ব শিশুর প্রায়। কত ভাবে পূজে তোমায় ফেরেশতা বহুপরী ইনসান।। নিরাকার তুমি নিরঞ্জন ব্যাপিয়া আজ ত্রিভুবন। পাতিয়া মনের সিংহাসন ধরিতে চাহে তবু প্রাণ।। (নজরুল ১৩৯৫:৬১) বরাত: ১। ফকীর আনোয়ার হোসেন (মন্টু শাহ) সম্পাদিত লালন-সঙ্গীত, ২য় খণ্ড, ছেঁউড়িয়া: লালন মাজার শরীফ ও সেবা-সদন কমিটি, ১৪০২। ২। (সম্পাদকের নাম ছাড়া) নজরুল ইসলামি সংগীত, কলিকাতা হরফ প্রকাশনী ১৩৯৫। ৩। J Lacan, Ecrits: A Selection, A Sheridan Trans.
New Yourk: WWNorton 1977.
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is নজর ল ইসল ম র স ক?
নজর ল ইসল ম র স ক is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does নজর ল ইসল ম র স ক matter?
নজর ল ইসল ম র স ক matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
