রামপুরে মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক
Banglaprabah.com – ম সল ম ন ত র গড় – উত্তর প্রদেশের রামপুর এলাকায় জুলাইয়ের তীব্র গরমে শতাধিক মানুষ মাটির চাটাইতে বসে স্লোগান দিচ্ছেন। রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকায় শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের পরও নতুন দিল্লির বিক্ষোভ থামলেও রামপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
বিশিষ্ট মুসলিম নেতা আজম খান এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছে।
ভবন ভাঙার নির্দেশ ও দাবি
রামপুর জেলা প্রশাসন ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করে। কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ভবনসহ মাত্র দুটি স্থাপনা বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা ও বিধিমালা ঠিকমতো মানা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছে প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে কথিত ‘অবৈধ’ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবনগুলো অপসারণে ব্যর্থ হলে বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালানো হবে। ভাঙার পুরো খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকেই আদায় করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
স্থগিতাদেশ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া
গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন তাদের আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে। তবে এতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ভবন ভাঙার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা হয়েছে কি না। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন আল–জাজিরাকে বলেন, এই স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, ‘এর অর্থ হলো, আরডিএ (রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) নির্ধারিত ৫ আগস্টের সময়সীমার মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন এমন একটি রায়ের চেষ্টা করছে, যাতে ভাঙার আদেশটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যায়।’
২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। তাঁদের কাছে সরকারের এই পদক্ষেপ একেবারেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিত আঘাত হিসেবে এসেছে। ১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রায় ২৪ কোটি মানুষের আবাসস্থল উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির শাসন চলছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী। তিনি মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির জন্য পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবনের চ্যান্সেলর ৭৭ বছর বয়সী আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির অন্যতম কড়া সমালোচক। তিনি সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।
জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রায় সব ভবন) ভেঙে ফেলার নির্দেশটি শিক্ষাবিরোধী এবং মানুষকে অশিক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অংশ।
সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতা জাভেদ আলী খান আল–জাজিরাকে এই কথাগুলো বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিনিধিত্ব করে।’
জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যাব প্রশ্ন তোলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের ফলে যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে এখানে এত শিক্ষার্থী আন্দোলন করার পরও উত্তর প্রদেশ সরকারকে কেন বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা যাবে না?’
এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিমের মধ্যে জনপ্রিয়। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত হিন্দু জাতিভুক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশও দলটিকে সমর্থন করে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ভবন ভাঙার আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

