মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও কেন ফুরায় না রফির আবেদন
ম ত য র ৪৬ বছর পরও - কলকাতার সদর স্ট্রিট থেকে নিউমার্কেট পার হয়ে বোবাজারের পথে হাঁটছিলাম শীতের এক সকালে। চারদিকে ভিড়, হর্নের শব্দ, ফেরিওয়ালার চিৎকারের মাঝে
Table of Contents
মৃত্যুর চৌয়ান্ন বছর পরেও কেন থেমে নেই রফির সুর
একটি পানের দোকান আর একজন শিল্পীর অনন্ত উপস্থিতি
Banglaprabah.com – ম ত য র ৪৬ বছর পরও – কলকাতার সদর স্ট্রিট থেকে নিউমার্কেট পার হয়ে বোবাজারের পথে হাঁটছিলাম শীতের এক সকালে। চারদিকে ভিড়, হর্নের শব্দ, ফেরিওয়ালার চিৎকারের মাঝে হঠাৎ কানে ধরা পড়ল একটা পরিচিত সুর। থেমে গেলাম। রাস্তার ধারে ছোট্ট এক পানের দোকান থেকে ভেসে আসছিল গানটি। দোকানটির নাম ‘তাজমহল পান শপ’, সামনে বড় করে লেখা—’সুন্দর পান, সুন্দর গান’। ভেতরে চোখে পড়ল মোহাম্মদ রফির সারি সারি ছবি, যত্নে সাজানো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই দোকানে বাজে শুধু রফির গান। যেন কোনো পানের দোকান নয়, বরং এক কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি নীরব শ্রদ্ধার এক জাঙ্গা।
গত ৩১ জুলাই মনে পড়ে গেল সেই দোকান। ভেবেছিলাম, একজন শিল্পীর সর্বোচ্চ অর্জন হয়তো ঠিক এইটাই—মৃত্যুর চার দশকের বেশি পরেও তাঁর সুর কোনো বিশেষ উপলক্ষের অপেক্ষায় থাকে না; মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে।
অ্যালগরিদম নয়, একটা টান
সেদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতবারই নিউজফিডে ঢুকেছি, প্রায় প্রতিবারই সামনে এসেছে রফির ছবি, তাঁর গানের লিংক, অথবা তাঁকে ঘিরে মানুষের নানা স্মৃতিচারণ। বৈশিষ্ট্য হিসেবে অ্যালগরিদমের একটা স্বভাব আছে—যে বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়, সেটাই ঘুরেফিরে সামনে এনে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটছিল। কিন্তু রফির ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু অ্যালগরিদমে আটকে থাকেনি। এক গান থেকে আরেক গান, এক স্মৃতি থেকে আরেক গল্প—বারবার রফির কাছেই ফিরেছি। জন্মদিন পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন, তবু তাঁকে নিয়ে সেই মুগ্ধতা কাটেনি। বরং মনে হয়েছে, রফির মতো শিল্পীকে স্মরণ করার জন্য বিশেষ কোনো দিন আসলেই জরুরি নয়। সেই টান থেকেই একটু দেরিতে হলেও ফিরে দেখা তাঁর জীবন, গান আর সেই অনন্য কণ্ঠের গল্প।
৩১ জুলাই ১৯৮০: থেমে যাওয়া এক কণ্ঠ
চৌয়ান্ন বছর আগে, ১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই থেমে গেল সেই সুরেলা কণ্ঠ। সকাল থেকেই শরীরটা ভালো ছিল না। তবু কাজ থামাননি। একটি গানের রেকর্ডিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, নিজের মতো করে অনুশীলনও করছিলেন। হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও আর তাঁকে ফিরিয়ে আনা গেল না। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে থেমে গেল উপমহাদেশের অন্যতম মধুর সেই সুর।
মুম্বাইয়ের সেই বৃষ্টিভেজা দিন
পরদিন মুম্বাই যেন অন্য এক শহর হয়ে গেল। অঝোর বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়। সংগীতশিল্পীর শেষযাত্রায় এমন জনসমুদ ভারত খুব কমই দেখেছে। রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার—কে ছিলেন না সেই শোকমিছিলে! বান্দ্রার মসজিদে মানুষের ঢল সামলাতে হিমশিম খেয়েছিল পুলিশ। পাঁচিল টপকে, জামাকাপড় ছিঁড়ে, এমনকি রক্তাক্ত হয়েও মানুষ শুধু একবার প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল। সেই দৃশ্য আজও ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়, বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন সংগীত আলোচকেরা।
প্রজন্ম বদলায়, সুর বদলায় না
চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু মোহাম্মদ রফির গান এখনো নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে জাঙ্গা করে নেয়, সংগীতশিল্পীদের কাছে হয়ে ওঠে শিক্ষার উপকরণ, আর শ্রোতাদের কাছে থেকে যায় আবেগের অন্য নাম। প্রজন্ম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, গান শোনার মাধ্যম বদলায়; কিন্তু তাঁর কণ্ঠে গাওয়া সেই সুরগুলো বারবার ফিরে আসে। নতুন শ্রোতা আবিষ্কার করে, পুরোনো শ্রোতা ফিরে যায় নস্টালজিয়ার। আমার দেখা কলকাতার সেই ছোট্ট পানের দোকানটি যেন তারই একটি প্রতীক। যেখানে প্রতিদিন বাজতে থাকা কয়েকটি গান মনে করিয়ে দেয়—রফিরা আসলে কখনো বিদায় নেন না; তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের স্মৃতিতে, অভ্যাসে আর ভালোবাসায়।
এক ফকিরের গান বদলে দিয়েছিল জীবন
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের কোটলা সুলতান সিং গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম মহম্মদ রফির। পরিবারের সবাই তাঁকে ডাকতেন ‘ফিকু’ নামে। ছোট্ট গ্রামের সাধারণ জীবন, গবাদিপশুর পাল আর মাটির পথ—এই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশ। কিন্তু সেই গ্রামেই প্রায়ই আসতেন এক ভ্রাম্যমাণ ফকির। হাতে এক তারাসদৃশ বাদ্যযন্ত্র, কণ্ঠে ভজন ও লোকগান। সেই ফকিরের গান যেন সম্মোহিত করে ফেলেছিল ছোট্ট রফিকে। ফকিরের গান শুনতে শুনতেই সংগীতের প্রেমে পড়ে গেলেন তিনি। বয়স তখন মাত্র আট-নয় বছর। সুযোগ পেলেই নীরবে ফকিরের পিছু নিতেন।
একদিন বিষয়টি চোখে পড়ে সেই ফকিরের। তিনি জানতে চান, কেন প্রতিদিন তাঁর পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলেটি। লাজুক কিশোর রফি জবাব দেন, তাঁর কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গেছেন তিনি। ফকির যে গানটি গাইছিলেন, সেটিও তিনি মুখস্থ করে ফেলেছেন। বিস্মিত ফকির তখন তাঁকে গান গাইতে বলেন। শিশুর কণ্ঠে নিজের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেন রফিকে।
পরে রফির ছেলে শাহিদ রফি এক সাক্ষাৎকারে এ ঘটনাকেই বাবার সংগীতজীবনের প্রথম বড় প্রেরণা বলে উল্লেখ করেছিলেন।
মায়ের নীরব সমর্থন আর শাস্ত্রীয় তালিম
তবে পরিবারের সবাই যে তাঁর গান গাওয়ার পক্ষে ছিলেন, তা নয়। রফির বাবা চাইতেন ছেলে অন্য পেশায় মন দিক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান মা। ছেলের চোখে গানের প্রতি ভালোবাসা দেখে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন—
চিন্তা করিস না, আমি সবটা সামলে নেব।
মায়ের সেই নীরব সমর্থনই রফিকে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছিল। এরই মধ্যে পরিবার অমৃতসর ছেড়ে লাহোরে চলে আসে। নতুন শহরে বড় ভাইয়ের বন্ধু আবদুল হামিদের উৎসাহে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন রফি। ওস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবন লাল মাট্টু, ফিরোজ নিজামীর মতো গুণী শিক্ষকের কাছে তিনি গড়ে তোলেন সেই কণ্ঠ, যা পরে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রিয় কণ্ঠগুলোর একজন হয়ে ওঠে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ম ত য র ৪৬ বছর পরও?
ম ত য র ৪৬ বছর পরও is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ম ত য র ৪৬ বছর পরও matter?
ম ত য র ৪৬ বছর পরও matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
