বানরের সাথে মানুষের সম্পর্ক: বাঁদরামির ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
করমজলের একটি স্মরণীয় ঘটনা
Banglaprabah.com – ব নর র সঙ গ ব দর – কয়েক বছর আগে গবেষণা কাজে সুন্দরবনের করমজলে গিয়েছিলাম। শীতের ভোরবেলায় চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। পশুর নদের স্রোতস্বিনী পানিতে সূর্যের সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। জোয়ারের পানিতে জেগে উঠেছিল নানা জাতের কাঁকড়া ও মাছ। ট্রেইল ধরে হাঁটছিলাম নিরিবিলি বনতলে। হাতে ক্যামেরা, কোনো ব্যাগ নেই।
হঠাৎ মনে হলো কেউ পেছন থেকে আমার ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। একা তো বনের রাস্তায় কেউ নেই। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি, রেলিংয়ে ঝুলে থাকা নেতা গোছের বানরটি এক হাতে পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। আমি তাকাতেই সে আলগোছে হাতটা সরিয়ে নিল। একটু সরে গিয়ে অপরাধীর মতো তাকিয়ে রইল।
বাংলাদেশের বানর পরিচিতি
এই বানরের ইংরেজি নাম রিসাস ম্যাকাক। বাংলায় একে বানর, বান্দর, বাঁদর বা শাখামৃগ বলা হয়। বাংলাদেশে চার প্রজাতির বানর রয়েছে, যার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শালবন ও পাহাড়ি বনে এদের বসবাস। সুন্দরবনে নর-বানর না থাকলেও এই প্রজাতি বাদাবনের সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
শ্বাসমূল, ছইলা ও কেওড়া ফল, হেঁতালের মাথি খেয়ে এরা টিকে আছে। কালেভদ্রে কাঁকড়াও শিকার করে। মানুষের বসতি এলাকার সাথে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা এই বানর অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। ফলে বন ছাড়াও দেশের নানা জায়গায় এদের দেখা যায়।
ঢাকার সাধনা ঔষধালি এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ এই বানর বসবাস করছে। সিলেটের নানা মাজারে, গাজীপুরের বরমী বাজারে, মাদারীপুরের চরমুগুরিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দরেও এই বানরের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
পর্যটন এলাকায় বাঁদরামি ও ঝুঁকি
চিড়িয়াখানা ও পর্যটন এলাকায় বানরের সাথে মানুষের আচরণ বরাবরই অবন্ধুসুলভ। অনেক পর্যটক বাদাম, চিপস, কলা ইত্যাদি বানরের দিকে ছুঁড়ে মারেন। ফলে বানরের মধ্যে মানুষের কাছ থেকে খাবার পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। পরে কোনো পর্যটক খাবার না দিলে বানর হাতের ব্যাগ, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।
অনেক সময় বানর কামড়ে ধরে বা খামচি দিয়ে পর্যটকদের রক্তাক্ত করে দেয়। চিড়িয়াখানায় অনেকে অকারণে বানরকে ভেঁচি কাটে, ঢিল ছোঁড়ে, এটা-ওটা ছুঁড়ে মারে। বানর যতক্ষণ না কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, ততক্ষণ পর্যন্ত চলে মানুষের এই বাঁদরামি।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
দেশের বেশ কিছু বানর-থাকা এলাকায় কর্তৃপক্ষ বানরকে খাবার সরবরাহ করে। নিয়মিতভাবে বানরকে খাবার সরবরাহ করলে প্রজননক্ষমতা বেড়ে গিয়ে এদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে মানুষের সাথে বানরের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
বানরের সাথে সংস্রবের ফলে এরই মধ্যে বানর থেকে মানুষের মধ্যে নানা জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তেমনি মানুষ থেকেও বানরের মধ্যে নানা অণুজীব স্থানান্তরিত হয়েছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে চিড়িয়াখানার দর্শক বা বনাঞ্চলে পর্যটকদের বানর থেকে সাবধান থাকতে হবে। বানর আছে এমন পর্যটন এলাকায় হাতে কোনো খাবার বহন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

