লোকসভা স্থায়ী কমিটির নতুন সুপারিশ: বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
Banglaprabah.com – ভ রত সরক রক ব ল দ – ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের স্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। কমিটি নৗাদিল্লি সরকারকে গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও জনকেন্দ্রিক বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
ঐতিহাসিক ভিত্তি ও পূর্ববর্তী প্রতিবেদন
১৯৭১ সালের চেতনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গত বছর কমিটি একটি প্রতিবেদন পেশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতিতে বেশ কিছু সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার সেই পরামর্শ অনুযায়ী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বিস্তারিত জানিয়ে বৃহস্পতিবার লোকসভায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করা হয়।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ
কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন কমিটি গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিষয়েও জানতে চেয়েছিল। নৗাদিল্লি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসারে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।
কমিটির চোখে শেখ হাসিনার ভারতবাস এবং এই বিষয়ে ভারতের মনোভাব ‘সভ্যতার চেতনা ও মানবিক ঐতিহ্য’ দ্বারা চালিত।
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতকে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। নৗাদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়েও বারবার এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এক বিদেশি গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এরই মধ্যে তা জানিয়ে দিয়েছেন।
সংসদীয় বিনিময় ও কূটনৈতিক যোগাযোগ
কমিটি জোর দিয়ে বলেছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত দুই দেশের সংসদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিনিময়। বাংলাদেশের নতুন সংসদ ও সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অদূর ভবিষ্যতে সংসদীয় প্রতিনিধিদলের পারস্পরিক সফরের আয়োজন করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিনিময়কে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতবিরোধী বানান মোকাবিলা এবং ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধে নৗাদিল্লিকে তৎপর থাকার আহ্বানও জানিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
সীমান্ত সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
দুই দেশের মধ্যে অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষিত করার ওপরও সংসদীয় কমিটি জোর দিয়েছে। কমিটির সুপারিশ, যে যে এলাকাতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভবপর নয়, সেখানে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্ক নাজুক হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পরে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তারেক রহমানের নতুন সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে সংসদীয় কমিটি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকারের অংশগ্রহণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত শুভেচ্ছাবার্তা ও পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন ও আরও গতিশীল করতে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থ ও সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সব অমীমাংসিত বিষয় সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশও করেছে। কমিটি আশা প্রকাশ করেছে, নির্বাচিত ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরবে, গণতন্ত্র বিকাশিত হবে এবং ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

