চাঁদের আলোয় শেরপুরের আখড়ায় ফিরেছে রাইজ কারামের আনন্দ
Banglaprabah.com – চ দ র আল য় গ র – বৃষ্টিভেজা শরতের সন্ধ্যা নামার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামে তৈরি হয় এক বিশেষ অপেক্ষা। রাস্তার ধারে উপোস থাকা তিন কিশোরী—সুচিতা কিসপটটা, সুনিতা তিগগ্যা ও পূজা টুডু—গ্রামের শিশু-কিশোরদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যদিকে, উপোস পালন করা তিন কিশোর পাশের গ্রাম থেকে কারামগাছের ডাল সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। ডাল নিয়ে তারা ফিরলেই শুরু হবে ওঁরাও সম্প্রদায়ের রাইজ কারামের মূল আয়োজন।
পার্বতীপুর ইউনিয়নের বরেন্দ্রাঞ্চলের এই গ্রামে গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগের সেই দৃশ্য ছিল উৎসব, বিশ্বাস ও মিলনের এক জীবন্ত প্রকাশ। কারামের তিনটি ছোট ডাল নিয়ে ছেলেরা গ্রামে ফেরার পর নারী-পুরুষ, শিশু ও কিশোরদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রার মতো করে সেগুলো আখড়ায় নেওয়া হয়। মাদলের তালে গান ও নাচে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। পরে আখড়ার মাটিতে ডালগুলো স্থাপন করা হয় এবং তার চারদিকে আঁকা হয় আলপনা। এরপর শুরু হয় পূজা ও ধর্মীয় আচার।
আশ্বিনের কারাম, গ্রামের মিলনের আয়োজন
ওঁরাও ভাষার প্রচলিত নামে এই উৎসব ‘রাইজ কারাম’। সাধারণত আশ্বিন মাসে এর আয়োজন হয়। শরতের স্নিগ্ধ আবহে, বিশেষ করে চাঁদ ওঠা রাতে, গ্রামের আখড়ায় সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে উৎসবের নানা পর্ব। ডালপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর নাচ-গানেই ভরে ওঠে রাত। নারী-পুরুষের সঙ্গে শিশুরাও এই আনন্দে অংশ নেয়।
কারাম শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি কৃষি, প্রকৃতি এবং মানুষের মঙ্গলকামনার সঙ্গে যুক্ত এক সাংস্কৃতিক আয়োজন। প্রকৃতিনির্ভর জীবনের স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের প্রকাশও ঘটে এখানে। একটি ডালকে কেন্দ্র করে গ্রামের বহু মানুষ এক জায়গায় মিলিত হয়, একসঙ্গে আচার পালন করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।
শেরপুরে কারামের এই আয়োজন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে মিনতি বাকলার উদ্যোগে। তিনি এখন আর এই গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকেন না। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের ঠেকাপাড়া গ্রাম থেকে শ্বশুরবাড়িতে এসে গত তিন বছর ধরে তিনি উৎসবটি আয়োজন করে আসছেন। একসময় গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া কারামকে আবার মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
শুরুর বছরে শেরপুরের সব পরিবার এই আয়োজনে যুক্ত হয়নি। কিন্তু পরের বছর অংশগ্রহণ বাড়ে এবং এবার উৎসবের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। শেরপুরের মানুষের পাশাপাশি কোঠাডাঙ্গা, খারিপাড়া, জিনারপুর, দামকুড়া, হরিপুর, ধর্মপুর ও জামালপুরের মানুষও এতে অংশ নিয়েছেন। ফলে একটি গ্রামের উৎসব আশপাশের জনপদের মানুষের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
“হামনিতো এইই চাহিলা। মানুষকের সাথ মানুষ মিলজুলকে রাহিবে। সবে মিলকে কারাম কারবে। হামার স্বপন পূরণ হোয়িলা। এ গাঁওকের কারাম আর নাহি থামিলা।”
মিনতি বাকলার এই কথায় উৎসবটি টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। তাঁর কাছে কারাম মানে কেবল নিয়ম মেনে পূজা নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলা। গ্রামের ভেতরের বিভাজন পেরিয়ে সবাইকে একই আখড়ায় নিয়ে আসার চেষ্টা এই আয়োজনকে বিশেষ অর্থ দিয়েছে।
প্রচলিত রীতির সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির নতুন ছবি
রাজশাহী থেকে উৎসবে যোগ দেওয়া ওঁরাও নেতা বঙ্গপাল সরদার কারামের প্রচলিত আচার ও শেরপুরের আয়োজনের কিছু ভিন্নতা তুলে ধরেন। তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে সাদরি ভাষার পুস্তক প্রণয়নের কাজে এনসিটিবির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষ্যে, ওঁরাওসহ সাদরিভাষী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কৃষিজীবী মানুষ প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের কল্যাণের কামনায় কারাম পালন করে থাকে।
সাধারণ রীতিতে কারাম উৎসবের আগের দিন থেকে গ্রামের অবিবাহিত মেয়েরা উপোস পালন করে এবং নির্দিষ্ট কিছু আচার সম্পন্ন করে। শেরপুরে অবশ্য তিন কিশোরীর পাশাপাশি তিন কিশোরও উপোস করেছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দুজন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সদস্যও রয়েছে। মিনতি বাকলার শ্বশুরবাড়ির নারীরাও উপোস পালন করেছেন। প্রচলিত চর্চার তুলনায় এই অংশগ্রহণের ধরন আলাদা হলেও তা উৎসবকে আরও উন্মুক্ত রূপ দিয়েছে।
“প্রকৃতিপ্রেমী কৃষিজীবী ওঁরাওসহ সাদরিভাষী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা কৃষির, প্রকৃতির ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে কারাম উৎসবের আয়োজন করে।”
বঙ্গপাল সরদারের চোখে শেরপুরের আয়োজনে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও এর অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। নানা সম্প্রদায়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও অংশীদারত্বের জায়গা তৈরি হয়। লোকাচারের মূল চেতনা ধরে রেখে স্থানীয় বাস্তবতায় অংশগ্রহণের পরিসর বাড়ার এই প্রবণতা উৎসবের ধারাবাহিকতাকে শক্তিশালী করতে পারে।
“কারামের ধর্মীয় সব আচার অনুষ্ঠান মিনতিরা ঠিকঠাকভাবে হয়তো করতে পারে না। অনেক ব্যতিক্রম দেখলাম। কারামে সাধারণত গ্রামের কুমারী মেয়েরা আগের দিন থেকে উপোস থেকে নানা আচার পালন করে। কিন্তু এখানে দেখলাম, তিনজন কিশোরীর সঙ্গে তিনজন কিশোর উপোস করেছে। এদের মধ্যে আবার দুজন সাঁওতাল সম্প্রদায়েরও রয়েছে। যে বাড়ি থেকে কারামের আয়োজন অর্থাৎ মিনতি বাকলার শ্বশুরবাড়িতে তাঁর জায়েরাও উপোস করেছেন। কারামে এ রকম কিছু এর আগে দেখিনি। আমার কিন্তু ভালোই লাগছে। বলা যায় অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তা আছে মিনতির কাজর। তাঁর চিন্তাকে ভক্তি জানাই।”
কারামের তিন সময়
কারাম উদ্যাপনের সময়ভেদে এর আলাদা নাম রয়েছে। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায় যে কারাম পালিত হয়, তা ‘জিতিয়া কারাম’ নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের উৎসবটি রাইজ কারাম। আর দুর্গাপূজার দশমীর দিনে আয়োজিত কারামকে বলা হয় দাশাই কারাম। এই তিন ধরনের মধ্যে জিতিয়া কারাম তুলনামূলক বেশি পালিত হয়।
তবে বিভিন্ন এলাকায় কারাম আয়োজনের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। গ্রাম ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও সাদরিভাষী শিক্ষার্থীরা এ উৎসব পালন করছেন। শিকড়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এমন আয়োজনের তাৎপর্য রয়েছে।
শেরপুরের আখড়ায় তাই কারাম ডালের চারপাশে আঁকা আলপনা, মাদলের তালে নাচ এবং উপোস পালনকারীদের অপেক্ষা একটি বড় ছবির অংশ হয়ে ওঠে। হারিয়ে যেতে বসা একটি গ্রামীণ উৎসব আবার ফিরে এসেছে মানুষের অংশগ্রহণে। চাঁদের আলোয় সেই রাতের কারাম জানিয়ে দেয়, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা শুধু নিয়মে নয়, মানুষের একসঙ্গে থাকার ইচ্ছাতেও টিকে থাকে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is চ দ র আল য় গ র?
চ দ র আল য় গ র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does চ দ র আল য় গ র matter?
চ দ র আল য় গ র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

