রোম সম্রাটের সামনে ইমানের অগ্নিপরীক্ষা
রোমান দরবারে অটল ইমানের এক স্মরণীয় পরীক্ষা
Banglaprabah.com – র ম সম র ট র স - হিজরি ১৯ সালে খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর শাসনামলে রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়ে বন্দী হন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমি (রা.)। বন্দিত্বের এই ঘটনা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত দৃঢ়তার গল্প নয়; এটি বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও অন্য মুসলিম বন্দীদের প্রতি দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও স্মরণীয়।
রোমান সম্রাটের কানে পৌঁছেছিল, মুসলমানদের বিশ্বাস পর্বতের মতো অবিচল। তাঁরা দুনিয়ার লাভের মোহে কিংবা মৃত্যুর আতঙ্কে নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করেন না। কথাটির সত্যতা যাচাই করতে সম্রাট বন্দী আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.)–কে রাজদরবারে হাজির করার নির্দেশ দেন।
রাজত্বের প্রলোভনেও অনড়
দরবারে সম্রাট প্রথমে তাঁকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানালেন। বিনিময়ে ছিল মুক্তির প্রতিশ্রুতি। আবদুল্লাহ (রা.) পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলেন, এ প্রস্তাব গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
সম্রাট এরপর প্রলোভনের মাত্রা বাড়ালেন। তিনি বললেন, ধর্ম পরিবর্তন করলে নিজের রাজ্যের অর্ধেক তাঁকে দিয়ে দেবেন। তবু আবদুল্লাহ (রা.)–এর অবস্থান বদলাল না। সম্রাট আরও বললেন, রাজ্যের অর্ধেকের সঙ্গে নিজের ক্ষমতার অংশীদারও করা হবে তাঁকে।
ইমানের সঙ্গে সওদা হয় না। এর দামাদামি করা যায় না। পুরো রাজত্ব তো দূরের কথা, আপনার বা আমার বাপ-দাদার রাজত্ব এবং আরব-আজমের রাজত্বও যদি আমাকে দেন—আর তার বিনিময়ে যদি বলেন যে এক মুহূর্তের জন্য আমি নবীজির ধর্ম ত্যাগ করি, তবু আমি চুল পরিমাণও নড়ব না।
এমন জবাব সম্রাটকে বিস্মিত করেছিল। ক্ষমতা, সম্পদ বা মুক্তি—কোনোটিই তাঁর কাছে ইমানের বিকল্প হতে পারেনি।
ভয় দেখিয়েও ফল হয়নি
প্রলোভন ব্যর্থ হলে সম্রাট ভীতির পথ নেন। সৈন্যদের আবদুল্লাহ (রা.)–এর দিকে তির তাক করতে বলা হয় এবং আবারও ধর্ম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি জানিয়ে দেন, তাঁরা ইচ্ছামতো শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ধর্ম ত্যাগ করবেন না।
এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর খাবার ও পানীয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েক দিন না খেয়ে থাকার পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। কারারক্ষীরা তাঁর সামনে মদ ও শূকরের মাংস এনে জীবন রক্ষার জন্য খেতে বলে।
ইসলামে জীবন রক্ষার চরম প্রয়োজনে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা.) চিন্তা করলেন, শত্রুরা যেন তাঁর অবস্থাকে ইসলাম নিয়ে উপহাসের উপায় না বানায়। তাই তিনি ওই খাবার গ্রহণ করলেন না। পরে তাঁর সামনে হালাল খাবার দেওয়া হয়।
ফুটন্ত তেলের কড়াই
সম্রাট এবার আরও ভয়াবহ দৃশ্য তৈরি করেন। বিশাল কড়াইয়ে তেল ফুটিয়ে দুজন মুসলিম বন্দীকে পর্যায়ক্রমে তাঁর সামনে নিক্ষেপ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, এই দৃশ্য দেখে আবদুল্লাহ (রা.) ভয় পেয়ে যাবেন এবং ধর্ম পরিবর্তনে রাজি হবেন। কিন্তু তাঁর উত্তর আগের মতোই ছিল—এটি অসম্ভব।
মৃত্যুভয় দিয়ে তাঁকে দমাতে না পেরে সম্রাট অন্য প্রলোভনের ব্যবস্থা করেন। রাজ্যের অত্যন্ত সুন্দরী এক তরুণীকে তাঁর কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর দিকে চোখ তুলেও তাকাননি। এতে তরুণী বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তাকে একজন মানুষ নাকি পাথরের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনাগুলোতে বাহ্যিক প্রলোভন ও অন্তরের সংযমের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আবদুল্লাহ (রা.) কেবল নিজের মুক্তির চিন্তা করেননি; তিনি বিশ্বাসের মর্যাদাকেই সামনে রেখেছিলেন।
অশ্রুর প্রকৃত কারণ
শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ের সামনে দাঁড় করানো হয়। এ সময় তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সম্রাট মনে করেছিলেন, মৃত্যুর ভয়ে তিনি ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর কান্নার আসল কারণ ব্যাখ্যা করেন।
মৃত্যুর ভয়ে আমি কাঁদছি না। আমি এই চিন্তায় কাঁদছি যে এখনই আমাকে এই কড়াইয়ের মধ্যে ফেলা হবে এবং আমি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করব। আমার আফসোস, আমার দেহে যতগুলো পশম আছে, যদি ঠিক ততগুলো জীবন আমার থাকত এবং আল্লাহর পথে একের পর এক সবগুলো কড়াইয়ে বিলিয়ে দিতে পারতাম!
এই কথায় সম্রাট বুঝতে পারেন, ভয় দেখিয়ে তাঁকে লক্ষ্য থেকে সরানো যাবে না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা।
একটি চুমু, বহু বন্দীর মুক্তি
শেষে সম্রাট নতুন এক শর্ত দিলেন। তাঁর মাথায় চুমু দিলে আবদুল্লাহ (রা.)–কে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সব মুসলিম বন্দীকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। এবার আবদুল্লাহ (রা.) নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে বন্দীদের জীবন রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিলেন।
সামান্য একটি চুমুর বিনিময়ে বহু মানুষের মুক্তি সম্ভব—এই বিবেচনায় তিনি সম্রাটের কপালে চুমু দেন। সম্রাটও নিজের অঙ্গীকার পালন করে সব মুসলিম বন্দীকে মুক্তি দেয়।
মদিনায় ফিরে এ ঘটনার কথা খলিফা ওমর (রা.)–এর কাছে পৌঁছালে তিনি গভীরভাবে আপ্লুত হন। উপস্থিত সাহাবিদের তিনি বলেন, প্রত্যেক মুমিনের উচিত আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.)–এর মাথায় চুমু দেওয়া। এরপর খলিফা নিজেই তাঁর মাথায় চুমু খান।
এই ঘটনার শিক্ষা কেবল কঠিন অবস্থায় দৃঢ় থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে দেখা যায়, বিশ্বাসের প্রশ্নে আপসহীন থাকা এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়া—দুটিই একজন মুমিনের চরিত্রে একসঙ্গে থাকতে পারে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is র ম সম র ট র স?র ম সম র ট র স is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does র ম সম র ট র স matter?র ম সম র ট র স matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.