‘কিশোর গ্যাং’–এর হোতাদের নাম প্রকাশ ও বিচারের দাবি
শিশুদের অপরাধে টানার নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিচারের দাবি
Banglaprabah.com – ক শ র গ য এর হ - শিশু ও কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করা হলেও তাদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংগঠকদের পরিচয় প্রায়ই সামনে আসে না—এ অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছেন দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের বক্তব্য, কেবল কিশোরদের ‘গ্যাং’ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করলে সমস্যার মূল উৎস আড়ালেই থেকে যায়। শিশুদের অপরাধে যুক্ত করা ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আইনি জবাবদিহির ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় জরুরি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এশিয়ান সোশিও-লিগ্যাল সেন্টার ফর এম্পিরিক্যাল অ্যান্ড ডকট্রিনাল রিসার্চ—অ্যাসেন্ড আয়োজন করে ‘মূল্যহীন শৈশব-কৈশোর: শিশু নিয়োগ, প্রাপ্তবয়স্কের দায়মুক্তি ও সুরক্ষার অনভিপ্রেত মূল্য’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির। সভাটি পরিচালনা করেন অ্যাসেন্ডের নির্বাহী পরিচালক কে এম রাকিবুল ইসলাম।
কিশোরদের নয়, হোতাদেরও শনাক্ত করার তাগিদ
অ্যাসেন্ডের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কে এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, কিশোরদের বিভিন্ন অপরাধচক্রে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে গভীর আলোচনা দরকার। তাঁর মতে, যারা দূরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে বা সুবিধা নেয়, তারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
‘কিশোর গ্যাং’–এ কারা কিশোরদের সদস্য হিসেবে সম্পৃক্ত করে, সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কথিত গডফাদারদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায়, সে পথ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাসেন্ডের পরিচালক ও কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ডিন অধ্যাপক পারভেজ আহমেদও একই ধরনের পদক্ষেপের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শিশুদের অপরাধে ব্যবহারকারী হোতাদের শনাক্ত করে কঠোর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।
আলোচনায় উঠে আসে, শিশু সুরক্ষায় দেশে আইন থাকলেও কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশুকে অপরাধে নিয়োজিত করার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন—এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ, তদন্তের মান এবং অপরাধচক্রের নেতৃত্ব পর্যন্ত পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক নজরদারির ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু-কিশোর। এই বড় জনগোষ্ঠী সহজেই অপরাধের শিকার কিংবা অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। অভিভাবকদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং মাদকের সহজ প্রাপ্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একটি শিশুর চারপাশের পরিবেশ তার সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তাবোধে বড় প্রভাব ফেলে। পরিবারে সময় দেওয়া, বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বন্ধুমহল সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং আচরণগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো বিষয়গুলো এ আলোচনার প্রাসঙ্গিক অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে বোঝা যায়, শিশুদের শুধু শাস্তির দৃষ্টিতে না দেখে তাদের ঝুঁকি, ভয়, প্রলোভন ও সুরক্ষার প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রান্তিক পরিবারের উদ্বেগ তুলে ধরতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুই রিকশাচালক। কেরানীগঞ্জে রিকশা চালানো মো. ইউসুফ তাঁর চার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানান। শ্যামপুরের রিকশাচালক নিতাই দেবনাথ বলেন, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া তাঁর একমাত্র ছেলে, বয়স ১০ বছর, কোনোভাবে কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে কি না—এ দুশ্চিন্তা তাঁকে সব সময় ভাবায়।
এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কেবল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয় নয়; প্রতিদিনের জীবনযাপন করা পরিবারগুলোরও এটি বাস্তব আশঙ্কা। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলাধুলার জায়গা, মানসিক সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ এবং পারিবারিক সংযোগ শক্তিশালী করা তাই অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
অনলাইনে ও ধারণকৃত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ২৫টির বেশি দেশের গবেষকদের পক্ষ থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বক্তব্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সন্যাশনাল ল ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মার্ক এ ড্রাম্বল বলেন, কিশোর অপরাধের সঙ্গে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার যোগসূত্রও থাকতে পারে। এ ধরনের নেটওয়ার্কে শিশুদের কে যুক্ত করছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা দরকার বলে তিনি মত দেন।
কিশোর অপরাধের সমান্তরালে অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসাও চলে।
কলম্বিয়ার সাবেক উপ-বিচারমন্ত্রী এবং ওনিয়াতির আন্তর্জাতিক আইন-সমাজতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক কামিলো উমানিয়া বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং কিশোরদের এসব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর দৃষ্টিতে, শিশুদের সুরক্ষায় সমাজের প্রতিটি পর্যায়ের মানুষকে একসঙ্গে বসে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
আয়ারল্যান্ডের গবেষক ক্যাথরিন নটন শিশুদের দিয়ে অপরাধ করানোর সঙ্গে যুক্ত মূল ব্যক্তিদের নাম দ্রুত প্রকাশের আহ্বান জানান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়ানা ভালভের্দে, সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গের প্রভাষক ও গবেষক মার্টিন জুরমান, কলম্বিয়ার মিনিস্ট্রি অব জাস্টিসের ড্রাগস নীতি বিভাগের সাবেক পরিচালক দারিও সেনদোয়া জুলুগা এবং পাকিস্তানের সমাজবিজ্ঞানী জাফর ইকবাল।
তদন্ত, সংস্কৃতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব
সেনাবাহিনীর শিক্ষা পরিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম আমিরুল ইসলাম বলেন, একজন কিশোরের দেখভালের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব অনেক। শিক্ষার মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা তৈরি করা না গেলে বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রলোভনে শিশুদের অপরাধের পথে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি এস এম তাসমিরুল ইসলাম মনে করেন, যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় অনেক সময় মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কেবল অভিযুক্ত কিশোরকে ধরে ফেলাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্ররোচনা ও নেতৃত্বের উৎস পর্যন্ত তদন্ত পৌঁছানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান সাইয়্যিদ শাহজাদা আল কারীম বলেন, নাটক ও চলচ্চিত্রে কিশোর অপরাধের উপস্থাপন শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ফাতেমা তুজ জোহরা এবং দারুল আকরাম ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম শিশু সুরক্ষায় নীতিগত অগ্রাধিকার, নৈতিক মূল্যবোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনার মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট: শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমাধান মিলবে না। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কার্যকর তদন্ত এবং প্রাপ্তবয়স্ক হোতাদের জবাবদিহি—সবগুলো ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিলেই শিশুদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ক শ র গ য এর হ?ক শ র গ য এর হ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ক শ র গ য এর হ matter?ক শ র গ য এর হ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.