এই রাফিনিয়া যেন ধানের শিষের ওপর একটি শিশিরবিন্দু
Banglaprabah.com – এই র ফ ন য় য ন - রবি ঠাকুরের কবিতার লাইনগুলো নিশ্চয়ই জানা? ‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু...।’ পরের লাইনগুলোয় একটু পরে আসা যাবে। আগে এই লাইনগুলোর তরজমা হোক। রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেস চলে যাওয়ার পর হন্যে হয়ে স্ট্রাইকার খুঁজেছে বার্সেলোনা। পছন্দ ছিল একটাই—আতলেতিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ। সে জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চেষ্টা করেছে বার্সা। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার যত ইচ্ছাই থাকুক, আতলেতিকো তাঁকে ছাড়বে কেন! একে তো অমন একটা স্ট্রাইকারকে ছাড়লে তাদের লোকসান, তার ওপর লিগের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে আলভারেজকে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের পায়েই কুড়াল মারা। অতএব আলভারেজ মিশনে বহুদিন ধরে বহুভাবে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরেছে বার্সা। মৌসুম শুরুর আগে তাই প্রশ্ন উঠেছিল কাতালান ক্লাবটির সেন্টার ফরোয়ার্ড হবেন কে?
স্বয়ং বার্সার এক বোর্ড সদস্যই প্রাক্–মৌসুমে সেন্ট জর্জেস পার্কে বার্সার অনুশীলনে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে বলেছিলেন, ‘(দলে) কোনো সেন্টার ফরোয়ার্ড নেই।’. কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্নের অস্তিত্ব নেই। রসিকতা করে কেউ কেউ বলতে পারেন, বার্সার নীতিনির্ধারকদের হয়তো বিশ্বকবির ওই কবিতার পরের লাইনগুলো জানা ছিল! সে যাহোক, পরের লাইনগুলোয় ফিরে দেখা যাক—‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’ রাফিনিয়া এখন বার্সার সেই ‘শিশিরবিন্দু’। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে আগে রবি ঠাকুরের লাইনগুলোর সারমর্ম একটু বুঝিয়ে বলতে হয়। কবি বলছেন, প্রচুর অর্থ ও সময় খরচ করে মানুষ দূর-দূরান্তে সৌন্দর্য দেখতে ছুটে যায়, কিন্তু ঘরে কিংবা ঘরের কাছে থাকা সুন্দর রূপটি অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।.
বার্সার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরকার সেই ‘সৌন্দর্য’ অদেখা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চোখ ও মস্তিস্কের রাডারে ব্যাপারটা ধরা পড়েছে। তার আগে অবশ্য ক্যাম্প ন্যুর চৌকাঠের ওপাশে দু–পা ফেলে মাদ্রিদে গিয়ে আলভারেজ নামে আর্জেন্টাইন সৌন্দর্যের সন্ধান করেছেন বার্সার নীতিনির্ধারকেরা। সেখান থেকে ব্যর্থ মনোরথে ঘরে ফিরে বার্সার টিম ম্যানেজমেন্ট যেন হঠাৎ করেই ব্রাজিলিয়ান সেই ‘শিশিরবিন্দু’ আবিষ্কার করে ফেললেন! দরকার ছিল শুধু সেই ‘শিশিরবিন্দু’র অবস্থানটা একটু পাল্টানো। কোচ হান্সি ফ্লিক সেটা করার পর ফলটা মিলছে হাতেনাতে। চলতি মৌসুমে ৫ ম্যাচ খেলেছে বার্সা। সবগুলো ম্যাচেই শুরুর একাদশের হয়ে মাঠে নামেন রাফিনিয়া। তবে একটু অন্য ভূমিকায়। উইঙ্গার হিসেবে এত দিন খেললেও চলতি মৌসুমে রাফিনিয়াকে দেখা যাচ্ছে মুক্ত ফরোয়ার্ডের ভূমিকায়। তাতে ৫ ম্যাচে পেয়েছেন ৮ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। কিন্তু এটা তো মাঠের ফল। বার্সার নীতিনির্ধারকদের মনেও একটা প্রভাব পড়ার কথা। আলভারেজকে তাঁরা নিশ্চয়ই ভুলে গেছেন! কিংবা এভাবেও বলা যায়, উইঙ্গার থেকে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে রাফিনিয়া বার্সার আলভারেজ–বিরহ ভুলিয়ে ছেড়েছেন।.
বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে।. বার্সার সমর্থকেরা সে জন্য তাঁদের ক্লাবকে একটা ধন্যবাদও জানাতে পারেন। সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকে বার্সা আলভারেজের পেছনে ছুটতে শুরু করেছিল বলেই তো এই মৌসুমে রাফিনিয়ার ভেতরকার ফরোয়ার্ড–সত্তাটা জেগে উঠল! আর সেই সত্তায় শুধু গোল এবং অ্যাসিস্ট নয়, ফুটছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই ছন্দময় গতি, ড্রিবলিং, স্ট্যামিনা ও ফিনিশিং দক্ষতা। চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম গোলকেই উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন। বক্সে দৌড়ের ওপর রাফিনিয়ার পায়ে বল। তাঁকে ঠেকাতে ডাচ ক্লাবটির দুজন ডিফেন্ডার একসঙ্গে স্লাইডিং ডাইভে সামনে চলে এলেন। তখন রাফিনিয়ার বাঁ পায়ে যেন ফুটবল কবিতার ছন্দ!
আলতো স্পর্শে বলটা বাঁ দিকে যখন সরালেন, দুই ডিফেন্ডার তখন তাঁর সামনে দিয়ে স্লাইড করে যেন নেদারল্যান্ডসে চলে গেলেন! তারপর বাঁ পায়ের শটে গোল। জার্সি নম্বর ১১ হলেও কে বলবে এই রাফিনিয়া ৯ নম্বর নয়! বার্সার গোলের সমস্যা সমাধানে রাফিনিয়ার এগিয়ে আসা নতুন কিছু না। ২০২৪-২৫ মৌসুমে করেছিলেন ৩৪টি গোল ও ২৬টি অ্যাসিস্ট; যার মধ্যে লিগে অবদান ছিল ৩০ গোলে (১৮টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট)। বার্সাও জিতেছিল লা লিগা শিরোপা। আর রাফিনিয়াও উইঙ্গার পজিশন থেকে প্রথাগত ফরোয়ার্ডদের মতো বক্সে ঢুকে কিংবা তার আশপাশ থেকে গোলগুলো করেন এবং করান। সরাসরি সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তখনো খেলা শুরু করেননি। পরের মৌসুমে চোটের কারণে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকতে হলেও তাঁর কার্যকারিতা ছিল দেখার মতো। সেবারও ২১ গোল করার পাশাপাশি ৮ অ্যাসিস্ট করে বার্সার লিগ শিরোপা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বিশ্বকাপেও চোটে পড়ায় হলুদ জার্সিতে সেই রাফিনিয়াকে দেখা যায়নি। মরক্কো ও হাইতির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে খেলেছেন। গোল পাননি। চোটে পড়েন হাইতি ম্যাচে। সুস্থ হয়ে শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমেও গোল পাননি। ব্রাজিলও হেরে বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকে। এই বিশ্বকাপ চলার মাঝেই বার্সার আলভারেজের পিছু ছোটার খবর বেশি করে চাউর হয় সংবাদমাধ্যমে। রাফিনিয়ার কি তখন আঁতে ঘা লেগেছিল?
কে জানে! বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি রাফিনিয়া।. বার্সার জার্মান কোচ ফ্লিক কৌশলে দূরদর্শী মানুষ। বিশ্বকাপ শেষে এবারের মৌসুম শুরুর আগে রাফিনিয়ার পজিশন নিয়ে বার্সার অনুশীলনে বেশ কাজ করেন ফ্লিক। উইঙ্গার পজিশন থেকে তাঁকে সরিয়ে এনে মাঠের ভেতরে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুক্ত ফরোয়ার্ড হয়ে আক্রমণভাগ চষে বেড়ানোর ভার দেন রাফিনিয়ার কাঁধে। এতে শুধু বার্সার খেলার কৌশল বদলায়নি, আক্রমণভাগ নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসানও হয়েছে। তবে সন্দেহও ছিল। উইং পজিশনটা সাধারণত বল নিয়ে লম্বা দৌড়ের। সামনে প্রতিপক্ষ পেলে হয় পাস দিয়ে বল ছাড়তে হয় কিংবা ড্রিবলিং করে বেরিয়ে যেতে হয়। রাফিনিয়া এত দিন সেভাবেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকে একদম বক্সে কিংবা তার আশপাশে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলার কিছু ঝামেলা ছিল। জায়গাটা সংকীর্ণ, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জটলায় খেলার জায়গাও খুব কম মেলে। বার্সার খেলার ধাঁচের সঙ্গে মিলিয়ে ওই পজিশনে সফল হতে হলে পায়ের কারুকাজ থাকা বাধ্যতামূলক। এর সঙ্গে ফিনিশ করার সহজাত ক্ষমতাও লাগে। প্রশ্ন ছিল, রাফিনিয়া কি ওই পজিশনে মানিয়ে নিতে পারবেন?
উত্তর মিলছে মাঠেই। কতটা মানিয়ে নিয়েছেন এ মৌসুমে গোল–পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। আর গোল করার বাইরে সতীর্থদের নিয়ে যেভাবে খেলে যাচ্ছেন, তা হয়তো আরও বড় প্রমাণ। বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার, রাফিনিয়ার খেলা দেখে মনে হচ্ছে এটাই তাঁর চিরাচরিত পজিশন। বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি। আরও মজার বিষয়, ২০২২ সালে বার্সায় যোগ দেওয়ার সময় রাফিনিয়া কিন্তু বাঁ প্রান্তের উইঙ্গার ছিলেন না। ডান প্রান্তের উইঙ্গার হয়ে ক্লাবটিতে যোগ দিয়ে দেম্বেলে ও তারপর ইয়ামালের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সরে যান বাঁয়ে। ক্লাবের প্রয়োজনেই সেই রাফিনিয়া এখন ফরোয়ার্ড—ফোঁটা ফোঁটা শিশিরবিন্দুর মতো তাঁর একেকটি গোলে ব্রাজিলিয়ানের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি কি দেখছে বার্সা? উত্তর আপনার কাছে। .আবারও বার্সেলোনার পাঁচ গোল, এবার উড়ে গেল ফেইনুর্ড
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is এই র ফ ন য় য ন?এই র ফ ন য় য ন is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does এই র ফ ন য় য ন matter?এই র ফ ন য় য ন matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.