দিনু বিল্লাহর স্মরণে গণসংগীত, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা
Banglaprabah.com – দ ন ব ল ল হক স – গণসংগীতের বিকাশ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথচলা এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে গবেষক দিনু বিল্লাহর কাজকে নতুন করে স্মরণ করা হয়েছে রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে। তাঁর গণসংগীতবিষয়ক বই মিলিত প্রাণের কলরবকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, এই গ্রন্থ কেবল গানের ইতিবৃত্ত নয়; এটি একটি সময়ের মানুষের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ, মূল্যবোধ ও সংগ্রামেরও দলিল।
শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে ঢাকা থিয়েটার ও অনন্যা প্রকাশনীর যৌথ উদ্যোগে স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শেষে গণসংগীত পরিবেশন করে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী।
একটি সময়ের সাংস্কৃতিক মানচিত্র
অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হকের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক, নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ, গণসংগীত গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইম রানা এবং দিনু বিল্লাহর জীবনসঙ্গী মাহবুবা খানম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ।
মামুনুর রশীদ বলেন, দিনু বিল্লাহর বইয়ের শক্তি এর তথ্যনির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির সংযোজনে। বিভিন্ন গান কোন প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েছে, কোথায় পরিবেশিত হয়েছে এবং কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছে—এসব বিষয় বইটিতে জায়গা পেয়েছে। সেই সঙ্গে বহু শিল্পী, সুরকার ও গানের তথ্যও সংরক্ষিত হয়েছে, যা সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
‘মিলিত প্রাণের কলরব শুধু গণসংগীতের ইতিহাস নয়, একটি সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কোন গান কখন, কোথায় ও কীভাবে তৈরি ও পরিবেশিত হয়েছে, তার পাশাপাশি দিনু নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও যুক্ত করেছেন। ফলে হারিয়ে যাওয়া অনেক শিল্পী, সুরকার ও গানের তথ্য বইটিতে উঠে এসেছে।’
গণসংগীতকে শুধু বিনোদনের উপকরণ হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে, মানুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশে এবং সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার ভাষা গড়ে তুলতে এই ধারার গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দিনু বিল্লাহর গবেষণাকে সেই বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি প্রয়োজনীয় সংরক্ষণপ্রয়াস হিসেবে তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে।
নতুন প্রজন্মের জন্য গবেষণার ক্ষেত্র
মামুনুর রশীদ মনে করেন, দিনু বিল্লাহর কাজকে কেন্দ্র করে তরুণদের আরও অনুসন্ধানে এগিয়ে আসা দরকার। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, একটি প্রজন্ম ও সেই সময়ের বহু কুশীলবকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিশীলতা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সংগ্রামের মূল্যবোধ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
‘দিনু বিল্লাহকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, অনেককেই পাওয়া যাবে না। তবে সেই সময় ও সাংস্কৃতিক চর্চায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা দরকার। এ বইকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মের জন্য আরও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। সেই গবেষণার মধ্য দিয়ে তৎকালীন মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’
এই আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেবল সামরিক ঘটনার ধারাবিবরণী হিসেবে না দেখে এর সাংস্কৃতিক ভিত্তিও বোঝার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। গান, নাটক, সংগঠন এবং বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একটি জাতির সংকট, প্রতিরোধ ও প্রত্যাশার পরিচয় বহন করে। ফলে এসব ক্ষেত্রের দলিল সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
দিনু বিল্লাহর ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা
মফিদুল হক স্মরণ করেন ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক পরিবেশে দিনু বিল্লাহর সক্রিয় উপস্থিতির কথা। তাঁর ভাষ্যে, সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী দিনু বিল্লাহ সহজে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারতেন। একুশে ফেব্রুয়ারির আয়োজনসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ছিল।
‘দিনু ছিলেন স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের মানুষ। হাসিখুশি, সদালাপী দিনু খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। দিনু ছিলেন সংগীত অন্তপ্রাণ। একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল। অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিসরও ছিল বিস্তৃত। সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দিনুর জীবন ও লেখায় নানাভাবে ছাপ ফেলেছে।’
দিনু বিল্লাহর জীবনসঙ্গী মাহবুবা খানমের স্মৃতিচারণে অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। তিনি বলেন, শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের সঙ্গে তাঁর স্বামী অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন। মুক্তিযুদ্ধ দিনু বিল্লাহর ভাবনার একটি বড় জায়গা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা পৌঁছে দেওয়ার দায়বোধ তাঁর মধ্যে গভীরভাবে কাজ করত।
পারিবারিক স্মৃতিতে ‘মিষ্টি’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দিনু বিল্লাহর বোন, অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পী শিমূল ইউসুফ। ভাইকে তিনি ডাকতেন ‘মিষ্টি’ নামে। শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ভাইয়ের সাইকেলে চড়ে ছায়ানট, টেলিভিশন সেন্টার, রেডিওসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যেতেন তিনি। দিনু বিল্লাহর হাত ধরেই বহু গুণী মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
‘আমার জন্য মিষ্টি যা করেছে, এই জীবনে সেই ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। ছোটবেলায় তাঁর সাইকেলে চড়ে ছায়ানট, টেলিভিশন সেন্টার, রেডিওসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যেতাম। তাঁর হাত ধরেই বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল আমার।’
২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট কানাডায় দিনু বিল্লাহর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি দেহদান করে যান। এ প্রসঙ্গে শিমূল ইউসুফ বলেন, তাঁর ভাইয়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ যাঁদের শরীরে জীবনের অংশ হয়ে আছে, তাঁদের সঙ্গে বুক মেলাতে তাঁর ইচ্ছা করে।
‘আমার ভাইয়ের শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে যারা হাঁটছেন, তাদের সঙ্গে একটু বুক মেলাতে ইচ্ছা করে। আমার ভাই তো তাদের অংশ হয়ে আছে।’
লেখক, গবেষক ও নাট্যকর্মী
সাইম রানা গণসংগীতের ক্রমবিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে দিনু বিল্লাহর গবেষণার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কাজের মাধ্যমে গণসংগীতের বিভিন্ন পর্যায়, সংশ্লিষ্ট গান এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগের তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
দিনু বিল্লাহ ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। নাট্যচর্চার পাশাপাশি তিনি লেখালেখি ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে কাকা বাবুর টয় হাউজ, টয় হাউজ থেকে ১৯৭১: মৃত্যু ছায়াসঙ্গী এবং শহীদ আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে লেখা সুরের বরপুত্র।
স্মরণসভাটি দিনু বিল্লাহর ব্যক্তিজীবন ও কর্মজগতকে সামনে আনার পাশাপাশি গণসংগীতের উত্তরাধিকার সংরক্ষণের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একটি গানের পেছনে থাকা মানুষ, সময় ও আন্দোলনের ইতিহাস নথিবদ্ধ না হলে সাংস্কৃতিক স্মৃতির বড় অংশই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সেই অর্থে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ আগামী দিনের পাঠক ও গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে থাকবে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is দ ন ব ল ল হক স?
দ ন ব ল ল হক স is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does দ ন ব ল ল হক স matter?
দ ন ব ল ল হক স matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

