পারমাণবিক বোমার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়: জাপানে মার্কিন হামলার ৮১তম বার্ষিকী
Banglaprabah.com – ম স ট র প র স – ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের এই দুটি মারণাস্ত্র মুহূর্তে লাখো প্রাণ কেড়ে নেয়। তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত প্রভাবে মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম ট্র্যাজেডি রচিত হয়। এই হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি টানলেও, মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। আজ ৬ আগস্ট জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার ৮১তম বার্ষিকীতে এই আয়োজন।
যুদ্ধের রণক্ষেত্র পরিবর্তন ও জাপানের অনমনীয়তা
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস; জার্মানির নাৎসি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ততদিনে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু অক্ষশক্তির আরেক দেশ জাপান তখনো অনমনীয়, কিছুতেই তারা পরাজয় স্বীকার করবে না। ফলে মূল রণক্ষেত্র ছেড়ে যুদ্ধ তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ইউরোপ, নতুন শক্তি হিসেবে দ্রুত এগিয়ে আসছে সোভিয়েত ইউনিয়ন—এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের ওপর একক আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের সামরিক শক্তি দেখাতে চাইছিল যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে ছিল জাপানের করা অপমানের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াইয়ে অবস্থিত মার্কিন নৌ ঘাঁটি পার্ল হারবারে আকস্মিক আক্রমণ করে জাপানই যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টেনে এনেছিল। আক্রান্ত হওয়ার পরদিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মান সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসা বাকি ছিল। দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে জুলাই মাসে পটসডাম সম্মেলনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলো জাপানকে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু অনমনীয় জাপান একবাক্যে তা প্রত্যাখ্যান করে।
ম্যানহাটন প্রজেক্ট: ভয় ও প্রতিযোগিতার ফসল
ম্যানহাটন প্রজেক্ট: মারণাস্ত্র তৈরির নেপথ্যে পারমাণবিক বোমার ইতিহাস কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাফল্য নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতির ভীতি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতার ফসল। ১৯৩৮ সালে জার্মানিতে পারমাণবিক ফিশন আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আলবার্ট আইনস্টাইনসহ অনেক বিজ্ঞানী ভয় পেয়েছিলেন, নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার যদি সবার আগে পারমাণবিক বোমা হাতে পেয়ে যান, তবে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য।
এই ভয় থেকেই ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে চিঠি লেখেন। এর ধারাবাহিকতায় সূচনা হয় অত্যন্ত গোপনীয় ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর। নিউ মেক্সিকোর লস আলামোসে গড়ে তোলা হয় গোপন গবেষণাগার। ওই পারমাণবিক গবেষণাগারের সামরিক প্রধান ছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভস এবং বৈজ্ঞানিক পরিচালক ছিলেন জে রবার্ট ওপেনহেইমার। কয়েক শত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং শত কোটি ডলারের বাজেটে রাতদিন কাজ চলতে থাকে। অথচ যে ভয়ে এই মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। জার্মানির আত্মসমর্পণের পর নাৎসিদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে কেন ম্যানহাটন প্রজেক্ট বন্ধ হলো না? এর কারণ, মার্কিন সামরিক প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরা ততদিনে বুঝে গিয়েছিলেন, এই অস্ত্র কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করার অস্ত্র নয়, বরং এটি হবে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
ট্রিনিটি পরীক্ষা ও ওপেনহেইমারের শ্লোক
নিউ মেক্সিকোর আলামোগর্ডোর মরুভূমিতে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর ৫টা ২৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে ঘটে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা—যার কোডনেম ‘ট্রিনিটি’। সেদিন মরুভূমির বালির ওপর থেকে হঠাৎ এক বিশাল আগুনের গোলা ও ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী মাশরুমের আকারে আকাশে উঠতে শুরু করে। সেটির আলোর ঝলকানি সূর্যের মতোই উজ্জ্বল ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর টের পাওয়া যায় ঝাঁকুনি ও ফাটলের শব্দ। চারপাশের পর্বত থেকে তার প্রতিধ্বনি শোনা যেতে শুরু করে। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর তীব্রতা ছিল প্রায় ২১ কিলোটন ট্রাইনাইট্রোটোলুইন বা টিএনটির সমান। মুহূর্তের মধ্যে ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) উঁচু পরীক্ষার টাওয়ার এবং এর চারপাশের তামা ও লোহার তৈরি সব যন্ত্রপাতি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আকাশে তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব।
যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের চোখে ওই বিস্ফোরণ অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের অনুভূতি তৈরি করেছিল। নিজেদের সাফল্য দেখে শুরুতে তাঁরা সবাই উল্লাস করে উঠেছিলেন। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রের নতুন এক যুগে প্রবেশ করে। দাবি করা হয়, সে সময় ওপেনহেইমার ভগবদ্গীতার একটি শ্লোক বলেছিলেন। সেটি হলো, ‘এখন আমিই মহাকাল, আমিই বিশ্বের ধ্বংসকর্তা’। ওপেনহেইমার সংস্কৃত ভাষা জানতেন, গীতার শ্লোকও আওড়াতেন। তবে পরীক্ষার পারমাণবিক বোমার ধ্বংসের ক্ষমতা নিজের চোখে দেখার পর তিনি এ কথা বলেছিলেন কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে। পরে ১৯৬৫ সালে এনবিসি নিউজে প্রচারিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ডিসিশন টু ড্রপ দ্য বোম্ব’-এর জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওপেনহেইমার বলেন, ‘আমরা জানতাম পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। কয়েকজন হেসেছিল, কয়েকজন কেঁদেছিল, অধিকাংশ মানুষই ছিল নীরব। আমার হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্গীতার শ্লোকটি মনে পড়েছিল।’
আমরা জানতাম পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। কয়েকজন হেসেছিল, কয়েকজন কেঁদেছিল, অধিকাংশ মানুষই ছিল নীরব।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান, যার পরিণতিতে মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছিল। অপমানের প্রতিশোধ, জাপানের অহংকার দমন এবং বিশ্বকে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি দেখাতে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ম স ট র প র স?
ম স ট র প র স is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ম স ট র প র স matter?
ম স ট র প র স matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
